• ঢাকা
  • শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

ঋণ খেলাপির শীর্ষে বাংলাদেশ, আড়ালে ব্যাংক খাতের গভীর সংকট


নিজস্ব প্রতিবেদক সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ঋণ খেলাপির শীর্ষে বাংলাদেশ, আড়ালে ব্যাংক খাতের গভীর সংকট

ফাইল ছবি

আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী খেলাপি ঋণের হারে বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ, ঋণ খেলাপির দিক থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ সবার উপরে বা 'সেরা' অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজিরবিহীন নীতি সহায়তা বা ‘ছাড়’ সুবিধা দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়ে তৈরি হয়েছে বহুমুখী আলোচনা ও সমালোচনা। ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও হাজার কোটি টাকার বড় খেলাপিদের জন্য বারবার সময় ও সুদ মওকুফের সুবিধা প্রদান ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, তদারকির অভাব এবং পরিচালকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পুঞ্জীভূত হওয়া এই সংকটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

২০০৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুনে দাঁড়ায় দুই লাখ এক হাজার কোটিতে এবং ২০২৬ সালের মার্চে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ছাড়ায়। সবশেষ ২০২৫ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছয় লাখ ছয় হাজার পাঁচ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বড় খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপের চেয়ে ছাড় দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সাম্প্রতিক সার্কুলার অনুযায়ী, এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর তা পরিশোধের জন্য ১৫ বছর সময় দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি দিতে হবে না।

এর আগে গত বছরের প্রজ্ঞাপনে দুই শতাংশ নগদ টাকা জমা দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া অর্থনীতিতে গতি আনতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলও ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি-মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট, বাজারভিত্তিক সুদের চাপ এবং ১৮ মাসের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কারখানা চালু রাখা ও ব্যাংকে তাৎক্ষণিক তারল্য বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আমেরিকায় ক্রেডিট স্কোর শূন্য করা, চীনে সামাজিক ব্ল্যাকলিস্ট কিংবা ভারতে ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংক্রাপ্টসি কোডের মাধ্যমে সম্পদ নিলাম করার বিধান থাকলেও বাংলাদেশে অর্থঋণ আদালত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কম।

অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় লাগায় ব্যাংকগুলো মামলা করতে নিরুৎসাহিত হয়। তা ছাড়া বড় শিল্পগ্রুপগুলোর কারখানায় লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও রপ্তানির অবদান বিবেচনায় সরকার ও ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে 'বাঁচিয়ে রাখার' নীতি গ্রহণ করে। দেওয়ানি আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে বড় খেলাপিরা প্রভাবশালী আইনজীবী নিয়োগ করে বিচার দীর্ঘায়িত করে এবং রাজনৈতিক প্রভাবে অবলোপনের সুবিধা বাগিয়ে নেয়। 

এই নীতি সুবিধার ফলে খেলাপিদের মধ্যে ছাড় পাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে এবং ভালো ঋণগ্রহীতারা বৈষম্যের শিকার হবেন বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত বিচার, খেলাপিদের বিদেশে যাতায়াত ও নতুন ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক কমিশন গঠন না করলে এ সুবিধা অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে ব্যালেন্সশিট পরিষ্কার করতে সহায়তা করলেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকিং খাতের স্থায়ী ফিরতি পথ তৈরি করা কঠিন হবে।

এসএইচ 

Link copied!