• ঢাকা
  • শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

চীন সীমান্তের নতুন হ্রদ নেপালে কি আবারও ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনবে


আন্তর্জাতিক ডেস্ক আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম
চীন সীমান্তের নতুন হ্রদ নেপালে কি আবারও ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনবে

হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যার দুই দিন পর নেপাল-চীন সীমান্তে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। হ্রদটির পানি বাড়তে থাকায় আবারও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত বুধবার হিমবাহ ধসে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস হয়। 

বুধবারের (২৬ আগস্ট) হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৬৩৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।  এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি। 

শুক্রবার নেপালের রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা জানান, নদীতে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে জমে থাকা পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এর ফলে উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। পরে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।

রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, নদীতে পানির উচ্চতা বাড়ছে। তবে হ্রদটির আকার ও পানির সঠিক উচ্চতা এখনো জানা যায়নি।

কীভাবে তৈরি হলো নতুন হ্রদ

বিজ্ঞানীদের ধারণা, সাম্প্রতিক এই দুর্যোগের ফলে দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। একটি হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায়, যেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি আটকে গেছে। অন্যটি তুলনামূলকভাবে বড় এবং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নেপালের একটি নদীর ওপর বিশাল ভূমিধসের ফলে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে সেখানে এই হ্রদ তৈরি হয়েছে।

হিমবাহ ধসের সময় বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদী ও উপত্যকায় নেমে আসে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে একধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। সেই বাঁধের পেছনে পানি জমে হ্রদটির সৃষ্টি হয়েছে।

নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই বলেন, এটি সম্ভবত তুষারধস বা বরফ-পাথরের ধস থেকে তৈরি একটি প্রাকৃতিক হ্রদ। বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর উপত্যকায় পড়ে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ বা সংকুচিত করে দেয়। পরে সেখানে পানি জমে হ্রদ তৈরি হয়।

নেপালি গবেষক ও ভৌত ভূগোলবিদ নিতেশ খাডকা বলেন, স্যাটেলাইট ছবি ও ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওতে দুটি হ্রদের অস্তিত্ব দেখা গেছে। একটি চীনের অংশে ওপরের দিকে এবং অন্যটি নেপালের লেহেন্দে নদীতে তৈরি হয়েছে।

কোথায় এই হ্রদ

নতুন হ্রদটি নেপালের রাসুয়া জেলায় ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে লেহেন্দে নদী ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে। এটি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে অবস্থিত। এই দুই নদীর পানি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে কাঠমান্ডুর দিকে যায়।

ফলে হ্রদটির বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের পানি নেমে এলে নিম্নাঞ্চলে থাকা জনপদ, অবকাঠামো ও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

কেন এত বড় ঝুঁকি

প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এসব হ্রদের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো হঠাৎ বাঁধ ভেঙে যাওয়া। পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ সাধারণত শক্তিশালী হয় না। পানি উপচে পড়তে শুরু করলে বাঁধ দ্রুত ক্ষয় হয়ে হঠাৎ ভেঙে যেতে পারে।

এ ধরনের ঘটনা ঘটলে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। পাহাড়ি খাড়া উপত্যকায় সেই পানির সঙ্গে পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ যুক্ত হয়ে বন্যার ধ্বংসক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

পবন ভট্টরাই বলেন, বিপদ শুধু হ্রদটির পানিতে নয়; হঠাৎ প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে খুব দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষবাহী বন্যা তৈরি হতে পারে। পাহাড়ি এলাকায় এ ধরনের বন্যার বিষয়ে সতর্ক হওয়ার জন্য খুব কম সময় পাওয়া যায়।

চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, হ্রদটিতে এরই মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে প্রবেশ করতে পারে। ৫০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।

নিতেশ খাডকা বলেন, হ্রদটির বাঁধ হঠাৎ ভেঙে গেলে আবারও বন্যা হতে পারে। এতে নদীতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে গিয়ে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে আশপাশে থাকা বেঁচে যাওয়া মানুষ, উদ্ধারকর্মী এবং নিচের দিকে থাকা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও টানেলে কর্মরত ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও নজরদারি

হ্রদটি যে এলাকায় তৈরি হয়েছে, সেটি দুর্গম ও খাড়া পাহাড়ঘেরা। ফলে সেখানে উদ্ধারকর্মী বা ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়াও কঠিন।

চীনা কর্তৃপক্ষ হ্রদটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশলী দল পাঠিয়েছে। দলটি আকাশপথে জরিপ ও ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির কাজ করছে।

প্রকৌশলী চেন হানশিয়াও চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিকে বলেন, হিমবাহ ধসের পর হ্রদের চারপাশে বিচ্ছিন্ন ও খাড়া পাহাড়ি অংশ তৈরি হয়েছে। এতে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হওয়া ঠেকানো সম্ভব না হলেও নিয়মিত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদীর পানির উচ্চতা মাপা, দ্রুত হ্রদ শনাক্ত করা এবং নেপাল ও চীনের মধ্যে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।

আবার শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ

নতুন হ্রদের পানি উপচে পড়ায় শুক্রবার রাসুয়া জেলায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে আবার অভিযান শুরু হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদ থেকে পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি এখন ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক কর্মকর্তা শুক্রবার জানান, বন্যায় ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আটজন স্বাস্থ্যকর্মী।

নেপাল জানিয়েছে, এই মুহূর্তে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, বিদেশ থেকে সহায়তার প্রস্তাব স্বাভাবিক বিষয়। তবে আপাতত নেপালের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করছে।

হিমালয়ে এমন ঘটনা নতুন নয়

হিমবাহ ধস ও হিমবাহের পানি থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ) হিমালয় অঞ্চলে আগেও ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞ পবন ভট্টরাই নেপালের ২০১২ সালের সেটি নদীর বন্যার উদাহরণ দিয়েছেন। ওই ঘটনায় ভূমিধস, সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বরফ-পাথরের ধস মিলিতভাবে ভয়াবহ বন্যা তৈরি করেছিল।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু পর্বতশ্রেণিতে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে। এতে নয়জন পশুপালক ও কয়েক শ প্রাণী মারা যায়। একই এলাকার আরেকটি হিমবাহ দুই মাস পর ধসে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে আসে।

২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের ছিংহাই প্রদেশের তিব্বতি মালভূমির উত্তর প্রান্তে কুনলুন পর্বতমালায় বুয়াকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকে প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই বরফ নিচের একটি হ্রদে আছড়ে পড়লে প্রায় ১৩ মিটার উঁচু ঢেউ সৃষ্টি হয় বলে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণে উঠে আসে।

পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের মে মাসে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় শিসপার হিমবাহ থেকে তৈরি বরফে আটকে থাকা একটি হ্রদ হঠাৎ ভেঙে বন্যা সৃষ্টি করেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে হ্রদের পানি নিরাপদভাবে কমানোর সুযোগ থাকলে তা করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়া এবং সময়মতো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সূত্র: আল-জাজিরা
এম

Link copied!