খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় রান্না করার সময় হঠাৎ গরুর মাংসের রঙ লাল থেকে সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
গত বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে একটি বেকারির কর্মীরা পিকনিকের জন্য কেনা মাংস রান্না করতে গিয়ে এই অদ্ভুত পরিবর্তনের মুখোমুখি হন। আতঙ্কিত হয়ে তারা রান্না করা কড়াইসহ সোজা থানায় গিয়ে হাজির হন। হঠাৎ মাংসের রঙ এভাবে বদলে যাওয়ার পেছনে আসল কারণ কী, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা কৌতুহল ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও অনুজীব বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এস মিনারা খাতুন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
তার মতে, কেবল ‘একদিনের পুরোনো মাংস’ হওয়ার কারণেই রঙ সবুজ হয়ে গেছে—এমন ধারণা যুক্তিযুক্ত নয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খাদ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে মুখরোচক গুজব নয়, বরং ল্যাব টেস্টের বৈজ্ঞানিক প্রমাণই একমাত্র নির্ভরযোগ্য।
মাংস সবুজ হওয়ার সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ:
অধ্যাপক মিনারা খাতুনের মতে, বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। রান্নার সময় বা সংরক্ষণে মাংস সবুজ হওয়ার নেপথ্যে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে:
• মাইওগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন: মাংসের নিজস্ব রঞ্জক পদার্থ মায়োগ্লোবিনের পরিবর্তনের কারণে রঙে অস্বাভাবিকতা আসতে পারে।
• ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব: হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপাদনকারী ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে মাংস ‘সালফমায়োগ্লোবিন’-এ পরিণত হলে সবুজ আভা দেখা দেয়। এ ছাড়া Pseudomonas-এর মতো পিগমেন্ট তৈরি করা জীবাণুর বংশবৃদ্ধিও এর বড় কারণ হতে পারে।
• সংরক্ষণ ও পরিবহনে ত্রুটি: জবাইয়ের পর সঠিক তাপমাত্রায় (০-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মাংস না রাখলে বা সঠিক নিয়মে পরিবহন না করা হলে এ সমস্যা তৈরি হতে পারে।
• আলোর প্রতিফলন ও তন্তুর গঠন: কখনো কখনো মাংসের পেশিতন্তুর গঠন এবং আলোর প্রতিফলনের (Optical refraction) ফলে সবুজ বা রংধনুর মতো আভা সৃষ্টি হতে পারে।
• ধাতব প্রভাব: অপেক্ষাকৃত বিরল হলেও কপারসহ অন্যান্য ধাতুর সংস্পর্শে এলে এমন রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।
মাংস সবুজ কিন্তু ঝোল লাল—এর কারণ কী?
ঘটনাটিতে রান্না করা মাংস সবুজ হয়ে গেলেও তরকারির ঝোল স্বাভাবিক লালই ছিল। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, সবুজ রঙের পরিবর্তন যদি মাংসের নির্দিষ্ট কিছু অংশে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে ঝোলের রঙে তার প্রভাব না-ও পড়তে পারে। কারণ ঝোলের রঙ মূলত মসলা ও রান্নার সময় উৎপন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করে। তাই ঝোল লাল দেখলেই যে মাংস শতভাগ নিরাপদ, এমন ভাবার কোনো বৈজ্ঞানিক সুযোগ নেই।
একই গরুর মাংস খেয়ে অন্যরা সুস্থ আছেন—বিক্রেতার এমন দাবির জবাবে অধ্যাপক মিনারা জানান, একই পশুর বিভিন্ন অংশে ব্যাকটেরিয়ার দূষণ, আর্দ্রতা বা সংরক্ষণের তাপমাত্রা ভিন্ন হতে পারে। ফলে একজনের কেনা মাংস স্বাভাবিক থাকলেও অন্যের কেনা মাংসে পরিবর্তন দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। বেকারির কোনো কেমিক্যালের প্রভাবে এমনটি হয়েছে—এমন ধারণারও কোনো জোরালো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
ক্রেতা ও ভোক্তাদের জন্য পরামর্শ
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অধ্যাপক ড. এম এস মিনারা খাতুন বেশ কিছু জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন:
১. মাংসে সবুজ রঙ, অতিরিক্ত দুর্গন্ধ কিংবা পিচ্ছিল ভাব থাকলে তা কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না।
২. জবাই থেকে রান্না পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে।
৩. ফ্রিজের ডিপ ও নরমাল চেম্বারের তাপমাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।
৪. মাংসে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করা গেলে সরাসরি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এম















-20260725114857.jpg)









-20260722160634.jpg)













