• ঢাকা
  • বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

শেষ মুহুর্তে শেখ হাসিনার সাথে যা ঘটেছিল!


নিজস্ব প্রতিবেদক আগস্ট ৫, ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম
শেষ মুহুর্তে শেখ হাসিনার সাথে যা ঘটেছিল!

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন ধরেই অনেকেই ‘আয়রন লেডি’ হিসেবে অভিহিত করতেন। টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা একজন প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করতে হবে- এটা হয়ত কেউই ভাবতে পারেননি আগে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই ঘটনাই ঘটে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা দেশত্যাগ করেন। কেমন ছিল চলে যাওয়ার আগের সেই কয়েক ঘণ্টা?

৪ আগস্ট সারা দেশে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জন নিহত হন। প্রাণ হারান কয়েকজন পুলিশ সদস্যও। দিন শেষে আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও উপদেষ্টা শেখ হাসিনাকে জানান, পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটছেন।

তবে তখনও শেখ হাসিনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব বলে বিশ্বাস করছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে জানান, সেই সুযোগ আর নেই।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জানান, রোববার থেকেই তার মা পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন।

অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সামরিক বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, শেখ হাসিনা কখন পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন এবং কখন গণভবন থেকে বের হয়েছেন, সে তথ্য জানতেন কেবল স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) এবং সেনা সদর দপ্তরের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়।

সেনাবাহিনীর সূত্রের বরাতে বিবিসি বাংলা জানায়, ৫ আগস্ট সকাল ১১টার মধ্যেই শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে তিনি প্রথমে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় যান। পরে ভারতের বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে তিনি ও শেখ রেহানা দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন।

বিবিসির সঙ্গে কথা বলা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শেখ হাসিনা দুটি সম্ভাবনা খোলা রেখেছিলেন। একদিকে প্রয়োজনে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল, অন্যদিকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টাও অব্যাহত ছিল।

সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, রোববারের সহিংসতার পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারীরা সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আসছিলেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয় এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই তারা শেখ হাসিনাকে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।

সোমবার সকাল থেকেই গণভবনের দিকে যাওয়ার বিভিন্ন সড়কে সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবস্থান নেয়। সেনাসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে নিরাপদে তেজগাঁও বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

একই সময় সকাল ৯টার দিকে প্রায় দেড় ঘণ্টার জন্য সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ রাখা হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার অবস্থান ও চলাচল সম্পর্কে তথ্য যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে, সে উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তিনি হেলিকপ্টারে ওঠার পর ইন্টারনেট সংযোগ আবার চালু করা হয়।

৫ আগস্ট সকালে গণভবনে শেখ হাসিনা তিন বাহিনীর প্রধান এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি নিরাপত্তা বাহিনী কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না, সে বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

একপর্যায়ে তিনি আইজিপির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, পুলিশ তো ভালো কাজ করছে। জবাবে আইজিপি জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুলিশের পক্ষেও আর দীর্ঘ সময় কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়।

এদিকে তখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লাখো আন্দোলনকারী জড়ো হতে শুরু করেছেন। সামরিক বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছিল যে এত বিপুল মানুষকে আর বেশিক্ষণ আটকে রাখা যাবে না। তারা গণভবনের দিকে অগ্রসর হলে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পরিকল্পনা ছিল-যদি ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি শক্তি প্রয়োগ করে থামানো যায়, তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন না। তবে, সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে দেশ ছাড়ার বিকল্প ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

এ লক্ষ্যে আগে থেকেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ভারত জানায়, বাংলাদেশের হেলিকপ্টারে করে আগরতলা পৌঁছাতে পারলে সেখান থেকে তাকে দিল্লিতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। পরে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই শেখ হাসিনা আগরতলায় যান এবং সেখান থেকে দিল্লিতে পৌঁছান।

সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসি বাংলাকে জানান, তার মা প্রথমে দেশ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তবে, পরিবারের সদস্যরা তার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।

সোমবার সকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার সঙ্গেও পৃথকভাবে আলোচনা করেন। তারা তাকে অনুরোধ করেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝিয়ে শেখ হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করাতে।

এরপর শেখ রেহানা বড় বোনের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু তখনও শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার পক্ষেই অবস্থান নেন। পরে বিদেশে অবস্থানরত সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে এক শীর্ষ কর্মকর্তা ফোনে যোগাযোগ করেন। জয়ও মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। সেই আলোচনার পর শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ এবং দেশত্যাগে সম্মতি দেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের কয়েক ঘণ্টার এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই শেষ হয় শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের।

এসএইচ 
 

Link copied!