শরীয়তপুরে ‘মিথ্যা মামলায়’ সাংবাদিক গ্রেফতার, বিএনপি নেতা-পুলিশ যোগসাজশের অভিযোগ

  • শরীয়তপুর প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মার্চ ২৪, ২০২৬, ১০:৪৪ এএম

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় এক বিএনপি নেতা ও পুলিশের যোগসাজশে ফয়জুল হাসান নামে এক সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে নড়িয়া থানার পুলিশের বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক ফয়জুল হাসান ওরফে হাসান হাওলাদারকে "সময়ের আলো" নামে একটি গণমাধ্যমের নড়িয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন।

নড়িয়া থানায় মামলা ও ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৮ মার্চ সন্ধা ৬ টা ৫৫ মিনিটে নড়িয়া উপজেলার রাজনগর ইউনিয়নের পুনাইখার কান্দি এলাকায় একটি অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয় রাজনগর ইউনিয়নের দরবেশ খার কান্দি এলাকার বাসিন্দা সোহাগ রাড়ী। ঘটনার পর আহত সোহাগ রাড়ীর পক্ষে তার মামা দুলাল মুন্সী নড়িয়া থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। সেখানে আসামী করা হয় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১০/১২ জনকে। পরে ৯ মার্চ এজাহারটি নড়িয়া থানায় মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয় এবং ওইদিন রাতেই মামলার ৬ নম্বর আসামী এবং গত ১৪ মার্চ বিকেলে ৮ নম্বর আসামী হাসান হাওলাদারকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠায় নড়িয়া থানা পুলিশ।

ওই মামলার ৮ নম্বর আসামী হাসান হাওলাদারের বাবা আবুল হোসেন দাবী করেন, মামলার ৩ নম্বর স্বাক্ষী সুজন বেপারীর পরিবারের সঙ্গে তাদের পরিবারের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। গত ৫ মার্চ ওই বিরোধ নিয়ে সুজন বেপারীসহ তার বাবা-চাচাদের বিবাদী করে নড়িয়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন হাসান। ওই অভিযোগ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে সুজন বেপারী মামলার বাদী ও পুলিশের সাথে যোগসাজশ করে হাসান হাওলাদারকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসান হাওলাদার ছোট থেকেই নড়িয়া সদরে বসবাস করেন। তিনি পূনাইখার কান্দি তার পৈত্রিক  গ্রামের বাড়ীতে কখনোই বসবাস করেননি। এমনকি মামলায় উল্লেখিত ঘটনার সময় তিনি নড়িয়া সদরে অবস্থিত তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করছিলেন। ওই সময়ের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায় সন্ধা সারে ৭টায় হাসান তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। আর এসময় ঘটনাস্থল ছিল রাজনগর ইউনিয়নের পুনাইখার কান্দি এলাকা যেখান থেকে অন্তত এক থেকে দের ঘন্টা দুরত্বের পথ।

কথা হয় মামলার বাদী দুলাল মুন্সীর সঙ্গে, তিনি তার মামলার আসামী হাসান হাওলাদারকে চিনেন না। কখনো দেখেননি। এমনকি ঘটনাস্থলেও দেখেননি। এরপরও কেন তাকে অভিযুক্ত করা হলো প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘স্বাক্ষীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে আসামী করা হয়েছে।’’

মামলার স্বাক্ষী ও বিএনপি নেতা সুজন বেপারীর কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলেন তিনি বলেন, ‘‘তার (হাসান) সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে কোন দন্ধ নাই। পারিবারিকভাবে জমিজমা নিয়ে অনেক আগে থেকে একটু ঝামেলা ছিল। সে বিষয়ে আমার তেমন ধারণা নেই। এরপর যে বিষয়টি এসেছে মামলার বেপারে মিথ্যা অভিযোগ, এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। যখন ঘটনা ঘটে, ঘটনাস্থলের পাশেই তার বাড়ী। সে তখন রাতে বাড়ীতেই ছিল এবং আরও কিছু লোক ছিল। তাদের শনাক্ত করেই মামলাটি দেওয়া হয়। আমি যতটুকু জানি বা দেখছি। এখন সে যদি নির্দোষ হয়, যদি কোন এভিডেন্স থাকে। সেটা সে প্রুভ দেখাবে। কারন দেশে আইন আছে, আদালত আছে তারাই এটা দেখবে।’’

গত ৫ মার্চ হাসান হাওলাদার বাদী হয়ে নড়িয়া থানায় দায়ের করা সুজন বেপারী ও তার বাবা-চাচাদের নামে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘না এটা আপনাদের মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে, যে অভিযোগ করা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এটা নিয়ে থানার দারোগা একটি বসারও ডেট দিয়েছে। সেটা সম্পর্কে আমার তেমন জানা নেই।’’

ঘটনার বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক(এসআই) আনছের আলীর সাথে দুই দফায় কথা হয়। প্রথমে তিনি বলেন, ‘‘এজাহার দেখছেন? এজাহারে তিনি ৮ নম্বর আসামী। তার কোন অপরাধ নাই।’’ 

অপরাধ নাই তাহলে গ্রেফতার হলো কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এজাহারনামীয় আসামী তাই গ্রেফতার করতে হয়েছে। এখন বাদী বা ভিকটিম বলতে পারে কে ছিল কে ছিলনা। কারন ঘটনার সময়তো আমরা ছিলাম না।’’

দ্বিতীয়বার কথা হলে আনছের আলী বলেন, ‘‘এখন প্রাথমিকভাবে বাদী এবং স্বাক্ষীরা বলতেছে তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত। তাই অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। যদি ঘটনার সত্যতা না পাওয়া যায় তাহলে তাকে আমরা বাদ দিয়ে দেবো।’’

মামলা রুজু হওয়ার আগে প্রাথমিক তদন্তে হাসান হাওলাদারের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘প্রাথমিক তদন্তে আমরা পেয়েছি ঘটনা ঘটেছে তাই মামলা রুজু করা হয়েছে।’’

তার (হাসান) কোন সম্পৃক্ততা পেয়েছেন কিনা আবারও জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি আয়ু হিসেবে এটাই বলতে পারি, সে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট না থাকলে তাকে আমরা বাদ দিয়ে দিবো। এটাই আমার বক্তব্য।’’

ঘটনাস্থল রাজনগর ইউনিয়নের পুনাইখার কান্দি এলাকার একাধিক বাসিন্দার সাথে কথা বললে তারা জানান, অভিযুক্ত হাসান হাওলাদার পুনাইখার কান্দি এলাকায় বসবাস করেন না। তিনি উপজেলা সদরে বসবাস করেন।

আসামী হাসান হাওলাদারের বাবা আবুল হোসেন বলেন, ‘‘আমার ছেলে হাসান জন্মগ্রহণ করেছে নড়িয়া উপজেলা সদরে। ও কখনো আমার গ্রামের বাড়ীতে থাকেনি। বর্তমানে আমি বৃদ্ধ হওয়ায় নড়িয়া আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে হাসান। পাশাপাশি সাংবাদিকতা করছে। ওইদিকে আমার গ্রামের বাড়ী পুনাইখার কান্দি নতুন নেতা হইছে সুজন বেপারী আমারই ভাতিজা, ওর বাপ-চাচাদের নিয়ে কয়েকদিন আগে আমার গ্রামের বাড়ীটি দখল করতে গেছে এবং ওই বাড়ীতে অবস্থানরত আমার স্ত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে আমার ছেলে হাসান জানার পর নড়িয়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছে। সেকারনে ওই এলাকায় কবে নাকি কাকে মারধর করছে সেই ঘটনার মামলায় আমার ছেলের নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। আর এই কাজ করছে সুজন বেপারী থানায় টাকা-পয়সা দিয়ে। এরপর গ্রেফতার করে আবার কোর্টে চলান করার পর জানতে পারি ওরে আরও একটা বোমাবাজি মামলায় ঢুকিয়েছে। আমার ছেলেকে মিথ্যা মামলা দিয়ে যে কলঙ্ক দেয়া হয়েছে আমি তার বিচার চাই।’’

এবিষয়ে জানতে চাইলে নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো: বাহার মিয়া বলেন, ‘‘বাদীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং এজাহারনামীয় ৮নং আসামীকে নড়িয়া বাজার থেকে গ্রেফতার করে যথারীতি আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে। এবিষয়ে তদন্ত অব্যাহত আছে। যদি কোন ব্যক্তি এ ঘটনায় জড়িত না তাকে তবে তাকে তদন্ত সাপেক্ষে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

মামলা রুজু হওয়ার আগে প্রাথমিক তদন্তে আসামী হাসানের জড়িত থাকার কোন প্রমাণ পাওয়া গেছে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে ওসি বলেন, ‘‘মামলার ঘটনার সত্যতার উপর মামলা রুজু হয়। এরপর তদন্তে যদি কারে জড়িত না থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তবেবতাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে।’’