কুয়াকাটা: ৮০ বছর বয়সী সেতারা বেগম। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর চাওয়া খুব সামান্য—একটু নিরাপদ আশ্রয়। ঝড়-বৃষ্টি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচতে তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন একটি ছোট্ট ঘরের আশায়—যেখানে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে পারবেন, মহান আল্লাহতালার ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন।
প্রায় ২৫ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। নেই কোনো সন্তান, নেই আপনজন—এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ একা সেতারা বেগম। ভাঙা-চোরা একটি জরাজীর্ণ ঘরেই কোনো মতে দিন কাটাচ্ছেন। সামান্য ঝড়েই ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এমন বাস্তবতার কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এই বয়সে তাঁর আর কোনো চাওয়া নেই—শুধু একটি নিরাপদ ছাদ, যেখানে নিশ্চিন্তে মাথা গুঁজে থাকতে পারেন।
তবে সেতারা বেগম একা নন। তাঁর মতো আরও অন্তত ৬৫টি পরিবার একই অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটার ১ নম্বর ওয়ার্ডের অরকা পল্লীতে। রোববার ( ১৯ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক ঘরেরই নেই ঠিকমতো চালা, নেই নিরাপদ দেয়াল, এমনকি পর্যাপ্ত খাবারেরও অভাব রয়েছে। কেউ ত্রিপল টাঙিয়ে কোনো মতে মাথা ঢেকে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচেই দিন পার করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরম আর্থিক সংকট।
অরকা পল্লীর বাসিন্দারা জানান, ২০০৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় তাদের সবকিছু ভেসে যায় বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে। ঘর-বাড়ি, সম্পদ, জীবিকা—সব হারিয়ে তারা আশ্রয় নেয় এই পল্লীতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই দারিদ্র্য আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তবে এখনো ৬৫টি পরিবার সেখানে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। একসময় এই এলাকা ‘৮০ ঘর’ নামে পরিচিত ছিল।
কুয়াকাটা তরুণ ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম ওয়াহিদ বলেন, এই মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।
এদিকে উপকূল নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ডু সামথিং ফাউন্ডেশন’-এর সদস্য জাহিদুল ইসলাম জানান, “আমরা তাদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলছি। আশা করছি খুব শিগগিরই আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারব।
একটি নিরাপদ ছাদ যা অনেকের কাছে সাধারণ বিষয়, সেটিই আজ সেতারা বেগমদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। এখন দেখার বিষয়, সমাজের সামর্থ্যবান ও মানবিক মানুষরা তাঁদের এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেন।
পিএস