আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়লে ওসি মোয়াজ্জেম

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: নভেম্বর ১৪, ২০১৯, ০৯:০৭ পিএম

ঢাকা: সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন, ‘আমার যা সাজা পাওয়ার তা বোধ হয় পেয়ে গেছি। দশটা খুন করলে এত কষ্ট পেতাম না। আমার পরিবার আমাকে ছেড়ে খারাপ অবস্থায় আছে। আমার ছেলে-মেয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আমার মেয়ে এবং মা শয্যাশায়ী।’ এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালতে জবানবন্দি দেন তিনি। 

ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের ধারণ করা জেলার মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দির ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোর অভিযোগে মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচারের আবেদন করেছেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে মামলাটির আত্মপক্ষ শুনানি শুরু হয়। সে সময় ওসি মোয়াজ্জেম কাঠগড়ায় দণ্ডায়মাণ ছিলেন। 

ওই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম শুনানির শুরুতে ওসি মোয়াজ্জেমের উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন এবং বাদীসহ ১১ জনের সাক্ষ্যে অভিযোগ পড়ে শুনিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, দোষী না নির্দোষ? 

জবাবে সে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবী করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। এরপর বিচারক ওসি মোয়াজ্জেমের কিছু বলার আছে কি না এবং সাফাই সাক্ষ্য দেবেন কিনা জানাতে চান। জবাবে সে জানায়, সাফাই সাক্ষ্য দেবেন না, তবে নিজে লিখিত বক্তব্য দেবেন। লিখিত বক্তব্যের কিছু তিনি মৌখিকভাবে বলতে চান। বিচারক অনুমতি প্রদান করেন। এরপর সে মৌখিক বক্তব্য শুরু করেন।

এদিকে, আত্মপক্ষ সমর্থনে ওসি মোয়াজ্জেম বলনে, আমার ১৯৯১ পুলিশের মধ্যে চাকরি হয়। ট্রেনিংয়ের সময় বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় থাকার জন্য নিয়োগ পেতে অনেক সময় লেগে যায়। এরপর এ বিষয় নিয়ে আমরা উচ্চ আদালতে যাই। দীর্ঘ ৬ বছর পর ১৯৯৭ সালের দিকে আমি চাকরিতে জয়েন করি। রাজধানীর তেজগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় সম্মানের সাথে আমি চাকরি করি। সম্মাননা স্বরূপ ২০০টির বেশি পুরস্কার করি। এর সাথে প্রমোশনও পাই। ২০১৮ সালের দিকে আমি সোনাগাজী থানায় যোগদান করি। ওখানে যাওয়ার পরে মাদসারা অধ্যক্ষ সিরাজ সম্পর্কে নানান অভিযোগ পাই। কিন্তু কেউ কখনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। 

এ বিষয়ে একটি দর‌খাস্ত আমাদের কাছে আসেনি। এর আগে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা নুসরাতকে উত্ত্যক্ত করে। কিন্তু কেউ কখনো তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসায় গোলযোগের কথা শুনে পুলিশ পাঠাই। ওই এলাকার লোক ধর্মান্ধ। কোনো হুজুরের বিরুদ্ধে কিছু বলার উপায় নেই। আমার থানায় তখন কোনো নারী অফিসার ছিল না। তাই আমি মেয়র, আমার অফিসার ও মাদ্রাসার লোকসহ সবার সামনে নুসরাতকে জিজ্ঞাসা করি। সেখানে নুসরাতের দুই বান্ধবী ও মাদ্রাসার কর্মচারী নুরুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদেরও ভিডিও করেছি। 

আমি নুসরাতকে বলেছি, তুমি আমার মেয়ের মতো। আমার প্রমাণের প্রয়োজন ছিল। তাই জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও করি। প্রমাণ পেয়ে মামলা নিয়ে প্রিন্সিপালকে আটক করি। পরদিন ২৮ মার্চ হাজার খানেক লোক প্রিন্সিপালের মুক্তির জন্য মানববন্ধন করে। সেদিন কয়েজন সাংবাদিক আমাকে সেই সময় নুসরাতের পক্ষের কেউ ছিল না। একমাত্র আমি ছাড়া। আমি নুসরাতের মাকে বলি কেউ যদি তাদের হুমকি দেয় সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাবেন। সেই জন্য তাদের হাতে কার্ড তুলে দেয়।

এর কিছুদিন মাদ্রাসায় পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা চলাকালীন শুনতে পাই কোনো এক মেয়ের গায়ে আগুন লেগেছে। তখন আমি ভাবতে থাকি ওই মেয়েটার আগুন লাগেনি তো। শোনামাত্র হাফ কিলোমিটার পথ দৌড়িয়ে যাই। সেখানে নুসরাতকে দেখতে পাই। অধীনস্থ তদন্ত কর্মতর্কাকে নুসরাতের চিকিৎসার জন্য সদরের পাঠানোর ব্যবস্থা করি। অবস্থা খারাপ হতে থাকলে তাকে ঢাকা বার্ন ইউনিটে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। সেখানে আমাদের এক সিনিয়র ‍অফিসারকে কল করে জানায়। তার চিকিৎসা যেন ভালোভাবে হয়। শাহবাগ থানায় আমি বিষয়টি অবহিত করি যেন তার ভালো চিকিৎসা হয়। 

ওই মাসের ৭ তারিখে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এর পরের দিন ৯ জনকে গ্রেফতার করি। ওই মাসের ৮ তারিখে সাংবাদিক সজল আমার চেম্বারে আসেন। ওই সময় আমার মোবাইল ফোন টেবিলে ওপর রেখে অন্য রুমে যায়। আর সাংবাদিক স্বজলকে আমার রুমে বসতে বলি। স্বজল আগে থেকে জানত আমার মোবাইলে ভিডিও ধারণ করা আছে। ওই সময় সজল আমার মোবাইল থেকে শেয়ারইটের মাধ্যমে ২টি ভিডিও চুরি করে। আমি তখন জানতে পারি। গত ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর খবর জানতে পারি। আমি নুসরাতকে মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকজন নিষেধ করেন। আমার ফেসবুক সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। আমার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই।’

তিনি বলেন, ‘এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারি নুসরাতকে নিয়ে আমার করা একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। পরে আমি শেয়ারইট চেক করি দেখি ৮ তারিখে সজল ভিডিওটা চুরি করে ছড়িয়ে দিয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল আমার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা শুনতে পাই। আমি যে ভিডিও টা করেছি সেটার কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিলো না। সেটা মাত্র মামলার ডকুমেন্ট হিসেবে রাখার জন্য করেছি। মামলা হওয়ার পর আমি ৯ জন আসমিকে গ্রেফতার করি। এতকিছু করার পরেও নুসরাতের বিরুদ্ধে গেলাম।’

এ ছাড়া মামলার বাদী সম্পর্কে ওসি মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক ফায়দার উদ্দেশ্য আমার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছে। বাদী সরকারপক্ষের লোক। সরকারের সু নজরে আশার জন্য এ কাজ করেছে। তাড়াছাও সে একজন ফেসবুক পপুলার মানুষ তার ভিডিও থেকে প্রতি মাসে ৩০/৪০ হাজার টাকা ইনকাম করে। আরও পপুলার হওয়ার জন্য মামলাটি দায়ের করেছে। উনি এক ভিডিও বলেছেন আমার জন্য নাকি আরও ১৭ খুন হয়েছে। উনি নাকি আগে থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে খুন হতো না। আমি যা করেছি আইনের পথে থেকে করেছি।’

একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, যা সাজা পাওয়ার তা পেয়ে গেছি। ১০টা খুন করলে এত কষ্ট পেতাম না। আমার পরিবার আমাকে ছেড়ে খারাপ অবস্থায় আছে। আমার ছেলেটা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এ সময় সে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এ সময় কাঁদতে কাঁদতে ওসি মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি এতই ঘৃণিত হয়ে গেছি যে, রংপুরে আমাকে ক্লোজড করার পর আমার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানোয় এমনটি হয়েছে। বাদী মামলা করার আগে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ মামলার আইও আমাকে ডাকলে আমি তাকে তদন্তে সহযোগিতা করেছি। আমি বলতে পারতাম মোবাইল হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমি তা করিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আইও সঠিকভাবে তদন্ত করেননি।’

এরপর বিচারক তাকে প্রশ্ন করেন যে, কোনো মামলা দায়ের বা তদন্তের জন্য বাদী বা সাক্ষীর বক্তব্য ভিডিও রেকর্ড করার আইনগত আবশ্যকতা আছে কিনা? জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আইনগত আবশ্যকতা নেই, তবে প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ায় এখন প্রত্যেক থানায়ই এমন কাজ করে। তা শুধু আদালত চাইলেই দেখানো হয়। পাবলিশ হয় না।’

সর্বশেষ মোয়াজ্জেম আর বলেন, ‘আল্লাহর ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। আমি ন্যায়বিচার চাই।’

এ দিন বিচারক বক্তব্য শেষে আগামী ২০ নভেম্বর যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেন।

গেল ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ রুমে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে আটক করে পুলিশ। ওই মামলা তুলে না নেওয়ায় অধ্যক্ষের অনুসারীরা কেরোসিন ঢেলে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থান নুসরাতের মৃত্যু হয়।

সোনালীনিউজ/এমএএইচ