ঢাকা : মিয়ানমার থেকে ইয়াবাসহ ১৭ ধরনের মাদকদ্রব্যের চালান দেশে আসছে। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে মাদক আসার হারও বেড়ে গেছে। এ কারণে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে।
এ অবস্থায় মিয়ানমার সীমান্তের ৪৮ ইয়াবা কারখানা ও ১২ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মায়ানমারের নিকট অনুরোধ জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মায়ানমার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে বলে অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে।
অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা বানানোর এসব কারখানার ৪৮টির মধ্যে ৩৭টির নাম ও ঠিকানা লিখিতভাবে মিয়ানমারের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট ডিভিশনকে (ডিইডি) দিয়েছে। জানা গেছে, এসব কারখানা থেকে ১৭ ধরনের ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার হয়।
সূত্র মতে, মিয়ানমারের রাখাইন, মংডু ও শান এলাকায় এসব কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলো মিয়ানমারের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ও মাদক ব্যবসায়ীরা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী গ্রুপ কাচিন ডিফেন্স আর্মি (কেডিআই)-এর ১০টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে।
এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত কুখাই এলাকায় পানসাই খেও মেও ইয়াং মৌলিয়ান গ্রুপের অধীনে সীমান্ত এলাকা নামখামে দুটি, হো স্পেশাল পিলিস জে হোলি ট্রাক্ট গ্রুপের অধীনে কুনলং এলাকায় একটি, মং মিল্লিটা শান স্টেট আর্মির (নর্থ) অধীনে ১ নং বেরিগেড ট্যানগিয়ান এলাকায় একটি, আনজু গ্রুপের একটি, শান ন্যাশনালিটিজ পিপল লিবারেশন (এসএনপিএল) গ্রুপের নামজাং এলাকায় দুটি, একই গ্রুপের মাহাজা ও হোমোং এলাকায় দুটি, ইউনাইটেড উই স্টেট আর্মি (ইউডব্লিউএসএ) গ্রুপের মংটন এলাকায় তিনটি, একই গ্রুপের মংসাত এলাকায় আরো দুটি এবং ত্যাছিলেক এলাকায় তিনটি, মংইয়াং এলাকায় চারটি কারখানা রয়েছে। এ ছাড়াও এই গোষ্ঠীর পাংসাং এলাকায় আরো দুটি কারখানা রয়েছে বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শান ন্যাশনাল পিপল আর্মির মওখামি এলাকায় দুটি এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালিন্স আর্মির (এমএনডিএ) কোকান এরিয়ায় একটি ইয়াবা তৈরির কারখানা রয়েছে।
এই কারখানা ছাড়াও যারা বাংলাদেশে নিয়মিত ইয়াবা চালান পাঠায় মিয়ানমারের এমন ১২ মাদক কারবারির নামের তালিকা দিয়ে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ওই ব্যক্তিরা সবাই রোহিঙ্গা এবং তারা মিয়ানমারেই থাকে। কেউ কেউ আবার বাংলাদেশের মোবাইল সিমও ব্যবহার করে।
এরা হলো-মংডুর মংগোলা এলাকার সাফিউর রহমানের ছেলে আলম (৩৭), মংডুর আকিয়াব এলাকার কেফায়েত আলীর ছেলে সাঈদ (৪০), মংডুর গাজুবিল এলাকার মৃত আহম্মেদের ছেলে কালাসোনা (৪০), বাদগাজুবিলিং এলাকার আব্দুল মোতালেবের ছেলে নূর, মংডুর করীমের ছেলে মহিবুল্লাহ, দইলাপাড়া এলাকার মৃত আমির আহম্মেদের ছেলে আব্দুর রশীদ, গুনাপাড়া এলাকার বাদলের ছেলে হারুন, সুদাপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে আলী জহুর, ফাইজাপাড়া এলাকার মৃত আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে সৈয়দ করীম, গুনাপাড়া এলাকার আলী আহম্মেদের ছেলে জায়ার এবং সাফিউর রহমানের ছেলে শাফি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার বলেন, ‘আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কিছু নাম মিয়ানমারকে দিয়েছি। সেগুলোর বিষয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের জানিয়েছে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, দেশে ২৪ ধরনের মাদকদ্রব্য আসছে। এর মধ্যে ১৭ ধরনের মাদকদ্রব্য শুধু মায়ানমার থেকে।
জানা গেছে, এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি.ডি.জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।
তবে সংখ্যায় এত হলেও আসলে বাংলাদেশের মাদকসেবীরা সেবন করে ৬ থেকে ১০ ধরনের মাদক। সবচেয়ে ভয়াবহতা ইয়াবাকে ঘিরে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবখানেই মিলছে ইয়াবা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার আরো বলেন, ‘আমাদের অভিযানে ১৫ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে। তবে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা আর ফেনসিডিলই বেশি। অন্যগুলো পরিমাণে খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে সাম্প্রতিককালে ইয়াবা বেড়ে যাওয়ায় অন্য মাদক পরিমাণে কম পাওয়া যাচ্ছিল। এখন অভিযান শুরুর পর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আমরা উৎস বন্ধ করার চেষ্টা করছি। ইয়াবাটা শুধু মিয়ানমার থেকেই আসে। আর অন্য মাদকগুলো আসে ভারত থেকে।’ চোলাই মদ এখানেই তৈরি হয়। আর গাঁজার কিছু চাষ গোপনে বাংলাদেশে হয়।
এদিকে মিয়ানমার থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ৯৮ শতাংশ মাদক পাচার বেড়েছে বলে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে অভিযোগ করেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে দেওয়া এক চিঠিতে এই অভিযোগ করা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০১১ ও ২০১২ সালের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই পাচার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। যা খুবই বিপজ্জনক। নতুন প্রজন্ম এই ইয়াবার প্রধান ভিকটিম বলেও মিয়ানমারকে কঠোরভাবে জানানো হয়।
মিয়ানমারকে ইয়াবার বিষয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পর দেশটি বাংলাদেশকে জানিয়েছে, ইয়াবার কাঁচামাল মিয়ানমারে পাওয়া যায় না। এটি থাইল্যান্ড ও চীন থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে তাদের দেশে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে মিয়ানমার ইয়াবা প্রস্তুত করলেও সে দেশে সরকারি হিসাবে মাদকাসক্তের সংখ্যা মাত্র তিন লাখ। মাদক নিরাময় কেন্দ্র আছে মাত্র ২৯টি। সে তুলনায় বাংলাদেশে মাদকাসক্তর সংখ্যা প্রায় ৩০ গুণ বেশি। ২০১৮ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে মাদকাসক্ত ৭০ লাখ। যা এখন কোটি ছাড়িয়েছে বলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আশঙ্কা। আর তাদের চিকিৎসায় দেশে ৩২৪টির মতো মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে।
সোনালীনিউজ/এমটিআই