ফেনীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কলেজছাত্র মাহবুবুল হাসান মাসুম হত্যা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ১৭১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ফেনীর দুই সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও অভিযুক্ত হয়েছেন।
বুধবার বিকেলে ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলি আদালতের বিচারক মোহাম্মদ হাসান অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এই আদেশ দেন। এর মাধ্যমে ফেনীতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া ২২টি মামলার মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো মামলার চার্জশিট গ্রহণ করলেন আদালত।
এর আগে বুধবার সকালে মামলাটির নির্ধারিত শুনানি শেষে আদালত আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে বিকেলে চার্জশিট গ্রহণ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ আসে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই ফেনী সদর আমলি আদালতে ১৭১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বাদীপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঞা জানান, মামলায় মোট ২২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫৬ জন এজাহারনামীয় এবং বাকি ৬৫ জন অজ্ঞাত। তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় ১০ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত এই মামলায় ৫১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে এখন পর্যন্ত মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা মামলা। এসব মামলায় দুই হাজার ১৯৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় চার হাজার অজ্ঞাত আসামি রয়েছে। এসব মামলায় এক হাজারের বেশি আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১১ জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জহির উদ্দিন মামুন জানান, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে কলেজছাত্র মাসুম হত্যাকাণ্ডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীকে সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাদেরই চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। ওই দিন ফেনীর মহিপালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা দাবিতে অসহযোগ কর্মসূচিতে অংশ নেন কলেজছাত্র মাহবুবুল হাসান মাসুম। সেখানে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট তার মৃত্যু হয়।
মাসুম ছিলেন সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের তরাব পাটোয়ারী বাড়ির বাসিন্দা। তিনি ছাগলনাইয়া আব্দুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন।
এই ঘটনায় ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নিহতের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১৬২ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
মামলায় আরও যাদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন, পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাজেল, সোনাগাজী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন এবং যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম পিটু ও জিয়া উদ্দিন বাবলু।
এই মামলার অগ্রগতি জুলাই গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টান্তমূলক ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসএইচ