বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শফিকুর রহমান ওরফে সাফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। আদালতে দেওয়া শিশুটির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো এবং খাবার না পেয়ে টয়লেটের পেস্ট ও পানি খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে আসামিদের রিমান্ড শুনানির সময় এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
শুনানির শুরুতে আদালত বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এমন ঘটনা জাতির জানার প্রয়োজন রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া আসামি শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বিথী এবং অপর দুই গৃহকর্মীর সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানির জন্য চার আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
নির্যাতনের বর্ণনা
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের প্রতিনিধি ফাহমিদা আক্তার বলেন, শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রথমে তাকে খাটে রাখা হলেও পরে মেঝেতে, বারান্দায় এবং শেষ পর্যন্ত টয়লেটে আটকে রাখা হয়। শীতের সময়ও তাকে শীতবস্ত্র দেওয়া হয়নি।
আদালতে উপস্থাপিত জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। হাতের আঙুল মসলা পেষার নোড়া দিয়ে থেঁতলে দেওয়া, লাঠি দিয়ে মারধর, চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া, মাথার চুল টেনে তোলা—এমন নানা নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে থাকায় তার পায়ের নখে পচন ধরেছে।
জবানবন্দিতে শিশুটি জানায়, কারণে-অকারণে তাকে মারধর করা হতো এবং নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না। বাথরুম ও তার আশপাশে তাকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হতো।
নির্যাতনের বর্ণনা পাঠের একপর্যায়ে উপস্থিত আইনজীবীরা আদালতকে আর না পড়ার অনুরোধ জানান।
শুনানিতে আদালত শফিকুর রহমানের স্ত্রী বিথীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি আংশিকভাবে নির্যাতনের কথা স্বীকার করেন বলে জানা গেছে। তবে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী দাবি করেন, শফিকুর রহমান অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতেন এবং এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না।
শুনানি শেষে আদালত শফিকুর রহমান ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুনের পাঁচ দিন, স্ত্রী বিথীর সাত দিন এবং অপর গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
যেভাবে সামনে আসে ঘটনা
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের জুনে মোহনাকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ওই বাসায় কাজের জন্য দেওয়া হয়। ২ নভেম্বর পর্যন্ত সে সুস্থ ছিল বলে পরিবার দাবি করে। এরপর তাকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
গত ৩১ জানুয়ারি শিশুটি অসুস্থ জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে বাবা গোলাম মোস্তফা মেয়েকে নিয়ে গেলে তার শরীরজুড়ে গুরুতর জখম দেখতে পান। তাকে দ্রুত গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটি অভিযোগ করে, শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী এবং অন্যরা তাকে নিয়মিত মারধর ও গরম খুন্তি দিয়ে দগ্ধ করতেন।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
এম