রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর প্রধান কার্যালয়ে সাম্প্রতিক এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বদলি নীতিমালা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে দূরবর্তী শাখায় বদলির ঘটনায় রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি বেসরকারি টিভি-তে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবের অভিযোগ উঠে আসার পর বিষয়টি সরেজমিনে অনুসন্ধান করে এ প্রতিবেদন। মতিঝিলস্থ সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, সোনালী ব্যাংকে বিদ্যমান জিয়া পরিষদের বর্তমান কমিটির ৩৪ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ২৫ জনই সাবেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। তাঁদের মধ্যে আটজন ইতোমধ্যে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি প্রধান কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে অসদাচরণ ও মব সৃষ্টির অভিযোগে সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচজন সক্রিয় নেতা ও তিনজন কর্মীসহ মোট আটজনকে “শাস্তিস্বরূপ” দূরবর্তী শাখায় বদলি করা হয়েছে।
বদলিকৃত কর্মকর্তারা হলেন—
সোহেল রায়হান (সিনিয়র অফিসার) টাঙ্গাইল, মাহবুব সোহেল (সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার) ফরিদপুর কর্পোরেট শাখা, আবু নায়েম (সিনিয়র অফিসার) সাভার, আব্দুর রশিদ (সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার) নরসিংদী, শরিফুল ইসলাম (সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার) গাজীপুর কোর্ট বিল্ডিং শাখা, জাহিদ খলিফা (সিনিয়র অফিসার) খাগড়াছড়ি, কে এম আবুল বাশার (প্রিন্সিপাল অফিসার ও জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক) মুন্সিগঞ্জ এবং আহসান আল আলভী (এজিএম) চাঁদপুরে বদলি হয়েছেন।
কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের জিয়া পরিষদের নেতা আ.হ.ম ফেরদৌস-উন-নবী ও তাঁর স্ত্রী বেগম তানিরা পারভীন মিলে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন তদবিরের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা প্রধান কার্যালয়েই কর্মরত থেকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “বদলি নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পর শাখা বা দপ্তর পরিবর্তন হওয়ার কথা। কিন্তু এই দম্পতি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রধান কার্যালয়ে বহাল রয়েছেন। এতে সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।”
আরেক কর্মকর্তা বলেন, “অফিস সময়ে সংশ্লিষ্ট নেতাকে নির্দিষ্ট ডেস্কে নিয়মিত পাওয়া যায় না। অথচ প্রায়ই তাঁকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দপ্তরে তদবির করতে দেখা যায়। এতে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে।”
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, “ব্যাংকের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অসদাচরণের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক বা সংগঠনিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়-এমন কোনো আচরণ বরদাশত করা হবে না। প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বদলিকৃত এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা একতরফা। প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করেই আমাদের দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হয়েছে। আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। মবের সময় আমরা এমডি স্যারের কক্ষে যাইনি, কোনো নথিতে আমাদের স্বাক্ষরও নেই। অদৃশ্য কারণে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত সক্রিয় ছিলাম। আগের সরকারের সময়ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বদলি হতে হয়েছে। অপরাধ না করেও শাস্তিমূলক বদলি দুঃখজনক।”
আরেক ভুক্তভোগী বলেন, “হঠাৎ বদলির কারণে পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা উচিত।”
এদিকে সাধারণ কর্মকর্তাদের মতে, একই দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত থাকা এবং সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাঁদের মতে, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বা সংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে তা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা জরুরি। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে।
এম