বৈরুত বিস্ফোরণের জেরে লেবানন সরকারের পদত্যাগ

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ১১, ২০২০, ০৯:৫৮ এএম

ঢাকা : বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের জেরে প্রবল গণবিক্ষোভের মুখে লেবাননের সরকার পদত্যাগ করেছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব সরকারের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমি সরকারের পদত্যাগ ঘোষণা করছি। সৃষ্টিকর্তা লেবাননকে রক্ষা করুক।’

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার আগে মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামাদ হাসান সাংবাদিকদের বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই পদত্যাগ করেছে। খবর বিবিসি ও আলজাজিরার।

জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে হাসান দিয়াব বলেন, ‘দুর্নীতির মহামারীর কারণেই বৈরুত বন্দরে ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দেশের চেয়ে দুর্নীতি বড় হয়ে উঠেছে। যারা এই দুর্যোগের জন্য দায়ী তাদের বিচারের আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘আজ আমরা জনগণের ইচ্ছাকে অনুসরণ করছি। জনগণ সাত বছর ধরে লুকিয়ে রাখা এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার চায়। তারা সত্যিকারের পরিবর্তন চায়।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমি আজ এই সরকারের পদত্যাগ ঘোষণা করছি।’ এদিকে প্রেসিডেন্ট মিশেল অউন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াবের কাছ থেকে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন।

৪ আগস্ট অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ভর্তি একটি গুদামে ছোড়া বিস্ফোরণে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের অর্ধেকই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মারা যান দুই শতাধিক মানুষ। আহত হন পাঁচ সহস্রাধিক।

এ ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন দেশটির মানুষ। গুদামটিতে সাত বছর ধরে উচ্চক্ষমতার দাহ্য পদার্থ পড়ে থাকলেও সরকার এর কোনো বিহিত করেনি।

কাস্টম কর্তৃপক্ষ বারবার তাগাদা দিলে সরকার কানে তোলেনি। এ কারণে শুক্রবার মধ্য বৈরুতে হাজার হাজার মানুষ একত্র হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। রাস্তায় টায়ার জালিয়ে আগুন দেন।

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি সরকারি দফতরে ঢুকে পড়েন। শুধু তাই নয়, তারা পার্লামেন্ট ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেন।

এদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সহস্রাধিক বিক্ষোভকারী আহত হন। বিক্ষোভ চলে শনি ও রোববার। এরই মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী।

আন্দোলনকারীরা সরকারের পদত্যাগসহ নানা দাবি তুলে ধরেন। তাদের মুখে একটাই স্লোগান ছিল- বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে। কারণ, লেবাননের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে তারা।

মানুষের নিরাপত্তা দিতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ লেবাননে বিদেশি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। তারা দশ বছরের জন্য লেবাননের কর্তৃত্ব ফ্রান্সের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানান।

এমন আহ্বান সম্বলিত একটি পিটিশনে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই পরপর সরকারের চারজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেন কয়েকজন এমপি। বিস্ফোরণের এক দিন পর সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে পদত্যাগ করেন জর্ডানে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূতসহ অন্যান্য দফতরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। বিক্ষোভকারীরা সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করল সরকার। গত জানুয়ারিতে ইরান সমর্থিত প্রভাবশালী হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী এবং এর মিত্রদের সমর্থন নিয়ে লেবাননের মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল।

সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে দাতারা : দুর্যোগকালে লোবাননের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে দাতা সংস্থাগুলো। তবে সাহায্য করার পাশাপাশি তারা চায়, লেবাননে সরকারের সংস্কার হোক। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উদ্যোগে রোববার বিশ্বদাতাদের ভার্চুয়াল সম্মেলন হয়।

এতে মানবিক ত্রাণ হিসেবে ২৯৮ মিলিয়ন ডলার সহায়তা জোগাড় হয়েছে বলে জানিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। দাতারা বলেছে, এই সহায়তা সরাসরি লেবাননের জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এর আগে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, দুর্নীতির কারণে তহবিলগুলো অন্যদিকে প্রবাহিত করা হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ) জানিয়েছে, লেবাননকে সহায়তার জন্য তারা নিজেদের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে প্রস্তুত। তবে এর আগে দেশটির সরকারকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেন, ‘সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলে লেবাননের জনগণের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন সাহায্যের দ্বার খুলে যাবে।’

লেবানন থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান ইরানের : বিপর্যস্ত লেবাননের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান। সোমবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্বাস মুসাভি এই আহ্বান জানান।

এ সময় তিনি বলেন, কিছু দেশ বিস্ফোরণের ঘটনাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্য চরিতার্থ করার জন্য এ বিস্ফোরণকে ব্যবহার করা উচিত হবে না। সতর্কভাবে বিস্ফোরণের কারণ উদঘাটন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই লেবাননকে সহযোগিতা করতে চায়, তবে দেশটির উচিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া।’

মঙ্গলবার বৈরুত বন্দরের একটি গুদামে জোড়া বিস্ফোরণ হয়। ওই গুদামে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট রাখা ছিল। বিস্ফোরণে বৈরুত শহর কেঁপে ওঠে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় অর্ধেক শহর। এ ঘটনায় পৌনে ২০০ লোক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ সহস্রাধিক।

গৃহহীন হয়েছেন তিন লাখ মানুষ। বিক্ষোভকারীদের দাবি সরকারের অবহেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। কাস্টম কর্তৃপক্ষ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছিল অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সরিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু সরকার আমলে নেয়নি। যার মাসুল দিচ্ছে দেশের মানুষ।

সোনালীনিউজ/এমটিআই