গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহার হতে পারে : যুক্তরাষ্ট্র

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২৬, ০৯:১২ এএম

গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেনি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজন হলে মার্কিন সেনাবাহিনী ব্যবহার করাও বিবেচনায় রয়েছে। এ অবস্থানকে ঘিরে ইউরোপীয় দেশগুলো ও কানাডা একযোগে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলায় দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন বলে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই পররাষ্ট্রনীতিগত লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসন বিভিন্ন পথ বিবেচনা করছে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের সামনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিকল্পও সবসময় খোলা থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ডেনমার্কের মতো দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্রের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা জোটের ভেতরে গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই ইস্যুতে পিছু হটার ইঙ্গিত দেয়নি। ২০১৯ সালে প্রথম মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দেওয়ার পর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে না থাকলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তার মতে, দ্বীপটি রুশ ও চীনা তৎপরতায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা ডেনমার্ক এককভাবে সামাল দিতে পারছে না।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে বর্তমানে বসবাস করেন মাত্র ৫৭ হাজার মানুষ। দ্বীপটির স্বশাসিত সরকার আগেই স্পষ্ট করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে আগ্রহী নয়।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এখানকার খনিজ সম্পদ ওয়াশিংটনের চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

হোয়াইট হাউসের বক্তব্যের পরপরই ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্য এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়—গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র সেখানকার জনগণ ও ডেনমার্কের।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে জানান, গভর্নর জেনারেল মেরি সাইমন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ শিগগিরই গ্রিনল্যান্ড সফর করবেন।

এ ছাড়া ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, আইসল্যান্ড ও ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আলাদা বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সমর্থন করেন। তারা বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে এবং ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় আরও জোরদার করা হবে।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেন, ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে আলোচনার আহ্বান জানান।

ডেনমার্ক ট্রাম্পের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যে তারা গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করতে অক্ষম। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ডে চীনা যুদ্ধজাহাজ বা অতিরিক্ত বিনিয়োগে ভরে গেছে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপটিতে বেসামরিক বিনিয়োগে আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান।

এরই মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক যৌথভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করেছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ও লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি জানান, তিনি ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বদলে সরাসরি গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সঙ্গে কথা বলতে চান।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কংগ্রেসে এক ব্রিফিংয়ে মার্কো রুবিও স্পষ্ট করেছেন—এই বক্তব্য তাৎক্ষণিক সামরিক হামলার ইঙ্গিত নয়; বরং ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।

তবে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে মন্তব্য করেন, বাস্তব বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য দিয়েই পরিচালিত হয়।

এ অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন কংগ্রেসের উভয় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা। সিনেটর জিন শাহিন ও থম টিলিস এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির প্রশ্নে স্পষ্ট ‘না’ বলার পর যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলা।

এম