পাক-আফগান সীমান্তের বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন ঘিরে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে চরম উত্তেজনায় পৌঁছেছে। পাকিস্তানের সেনা চৌকিতে হামলার পর ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে কার্যত সামরিক অভিযান শুরু করে, যার অংশ হিসেবে ‘অপারেশন গজব-লিল হক’ চালিয়ে রাজধানী কাবুলসহ পাকতিকা ও কান্দাহারে বিমান হামলা চালানো হয়।
পাকিস্তানের দাবি—এই অভিযানে শতাধিক আফগান তালেবান সদস্য নিহত হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী বেশ কিছু সামরিক অবস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। অপরদিকে আফগানিস্তান পাল্টা প্রতিরোধে বহু পাকিস্তানি সেনা হতাহতের দাবি করেছে।
সংঘাতের তাৎক্ষণিক কারণ
সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা। ইসলামাবাদের অভিযোগ, এসব হামলার সঙ্গে জড়িত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করছে।
পাকিস্তান বহুবার কাবুলকে এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি ইসলামাবাদের। এর জেরে সীমান্তে বিমান হামলা ও পাল্টা প্রতিশোধমূলক অভিযানের ধারা শুরু হয়।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’র ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করায় কঠোর জবাব দেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সবচেয়ে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি টিটিপি দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।
বন্ধুত্ব থেকে ফাটল
এক সময় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। সোভিয়েত-বিরোধী যুদ্ধে আফগানদের সহায়তায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ৯/১১-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনে সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায়।
আল-কায়েদা-র উত্থান, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে অভিযান এবং পাকিস্তানের পশ্চিমা জোটকে সহায়তা।
এসব কারণে তালেবানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চোখে পাকিস্তান ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে। এর ফলেই ২০০৭ সালে পাকিস্তানবিরোধী এজেন্ডা নিয়ে টিটিপির জন্ম হয়।
ওসামা বিন লাদেন ও সম্পর্কের নতুন মোড়
২০১১ সালে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মার্কিন অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অবস্থান নেয় আল-কায়েদা ও তাদের মিত্র সংগঠনগুলো।
তাদের বক্তব্য ছিল—পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সহযোগী হওয়ায় এটি ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’।
জাতিগত বাস্তবতা ও সীমান্ত সংকট
পাক-আফগান সীমান্তের দুই পাশেই বসবাসকারী পাস্তুন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ তালেবান মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় সীমারেখার চেয়ে জাতিগত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতা টিটিপি ও তালেবানের মধ্যে আদর্শিক ও সামাজিক সংযোগকে আরও শক্তিশালী করেছে।
নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ
সাম্প্রতিক সময়ে কাবুলের সঙ্গে ভারত-এর যোগাযোগও ইসলামাবাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তালেবান নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত যোগাযোগ হিসেবে দেখলেও পাকিস্তান এটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কূটনৈতিক ভারসাম্যহীনতা হিসেবে বিবেচনা করছে।
দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পেছনে রয়েছে— সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যু, ৯/১১-পরবর্তী ভূরাজনীতি, টিটিপির উত্থান, জাতিগত বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস।
ফলে একসময়কার কৌশলগত সহযোগিতা আজ রূপ নিয়েছে গভীর অবিশ্বাস ও সংঘাতে। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক এখন আর শুধু সীমান্ত ইস্যু নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হয়েছে।
এম