ঢাকা: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে আজারবাইজানে গোপনে নিজেদের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ দল মোতায়েন করেছিল ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেল আবিবের গোপন স্থাপনার যে নেটওয়ার্ক রয়েছে, এটি ছিল তারই অংশ। মূলত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সহজ ও জোরালো করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সম্পর্কে জানাশোনা আছে এমন চারটি নির্ভরযোগ্য সূত্র মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, আজারবাইজানের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গোপন জায়গায় অবস্থান নিয়ে এসব বিশেষ দল কাজ করত। এই জায়গাগুলো ইরানের উত্তর সীমান্তের খুবই কাছে অবস্থিত। এর মধ্যে সবচেয়ে কাছের অবস্থানটি ছিল ইরানের তাবরিজ শহর থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের সময় ইসরায়েল এই তাবরিজ শহরে বিমান হামলা চালিয়েছিল।
[271432]
অন্য দুটি সূত্র জানায়, ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলের বিশেষ কমান্ডো দলও মোতায়েন করা হয়েছিল। তারা মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ড্রোন পরিচালনার কাজ করত। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উত্তর ইরানের ওপর সার্বক্ষণিক কড়া নজর রাখার জন্য এটি ইসরায়েলের সামনে একটি দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছিল।
আজারবাইজানে এই গোপন সেনা মোতায়েনের খবরটি প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে সিএনএন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েল যেসব সামরিক অবস্থান তৈরি করেছিল, এটি তার মধ্যে অন্যতম কৌশলগত পয়েন্ট। এর ফলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এমন অনেক দুর্গম জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছিল, যা আগে কখনো সম্ভব হয়নি। এটি প্রমাণ করে, তেহরানের বিরুদ্ধে হামলায় ইরানের প্রতিবেশীদেরও প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল। ইসরায়েলি বাহিনী কিছু দেশের সম্মতি নিয়ে আর কিছু দেশের অজ্ঞাতে এই কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল, যার জেরে ইরানের প্রতিবেশীরাও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল।
সূত্রগুলো সিএনএনকে আরও জানিয়েছে, আজারবাইজানের ওই জায়গাগুলো ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশে ইসরায়েলের গোপন সামরিক স্থাপনা ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সোমালিল্যান্ড। প্রথমে জরুরি অবস্থায় উদ্ধারকারী দল হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও পরে এই বাহিনীগুলোর কাজের পরিধি বাড়িয়ে সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মতো সংবেদনশীল কাজ দেওয়া হয়েছিল। সূত্রগুলোর ভাষ্য, এসব মোতায়েনের ফলে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের দক্ষিণ, পশ্চিম এবং উত্তর সীমানার খুব কাছে অবস্থান নিতে পেরেছিল, যা তাদের সামরিক ক্ষমতাকে কয়েক শ মাইল প্রসারিত করে। এসব অগ্রবর্তী অবস্থানের কারণেই ইসরায়েল ইরানজুড়ে বারবার বড় ধরনের হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
অভিযানের পরিধি সম্পর্কে একটি সূত্র জানিয়েছে, আজারবাইজানের এই বিশেষ মিশনে কয়েক ডজন সেনা অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ইসরায়েলের স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্য, হেলিকপ্টার থেকে আক্রমণ ও উদ্ধারে অভিজ্ঞ এলিট বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত আজারবাইজান দূতাবাসের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য আজারবাইজানের ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে বলে যে ভিত্তিহীন দাবি করা হচ্ছে, আমরা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।’ এ ছাড়া এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সিএনএনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে একটি সূত্র জানায়, ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে অবস্থিত স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্র সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলকে আরও একটি সামরিক অবস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিল। এর ফলে ইরানে দূরপাল্লার বিমান হামলার সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো সম্ভবত সেখানে জ্বালানি ও রসদ নেওয়ার জন্য থামার সুযোগ পেয়েছিল। গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলই প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের এই গোপন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের খবরটিও সিএনএনই প্রথম প্রকাশ করেছে।
পাশাপাশি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কিছু সময় ধরে ইরাকেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দুটি গোপন স্থাপনা ছিল, যা প্রথম প্রকাশ করেছিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউ ইয়র্ক টাইমস। তবে এক বিবৃতিতে ইরাকের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মার্চের শুরু পর্যন্ত তাদের দেশে কোনো ‘অননুমোদিত ঘাঁটি বা বাহিনী’ ছিল না। অন্যদিকে, মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রথম জানায়, যুদ্ধের সময় ইসরায়েল গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি ও অন্যান্য সুরক্ষাব্যবস্থা বসিয়েছিল। যদিও এই খবর প্রকাশের পর আমিরাত শক্ত ভাষায় এর সত্যতা অস্বীকার করেছে।
ব্যবসায়িক ও সামরিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল এবং আজারবাইজানের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আজারবাইজান ইসরায়েলের প্রয়োজনীয় তেলের একটি বড় অংশের জোগান দেয়। এর বিনিময়ে ইসরায়েল আজারবাইজানের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রি করে, যার কিছু অংশ নাগোরনো-কারাবাখ যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বেগিন-সাদাত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গেরশোন কোগান লিখেছিলেন, ‘আজারবাইজানে ইসরায়েলের কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টি ইচ্ছা করেই হালকা করে দেখানো হয়, যা মূলত অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে টিকে রয়েছে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জশুয়া কুসেরার মতে, এই সম্পর্ক আজারবাইজানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুবিধাও এনে দিয়েছে, যার ফলে বাকু ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েলের প্রভাবকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে পারে।
এসআই