ফেরার পথেও ভোগান্তি কয়েকগুণ বেশি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ২০, ২০২১, ১২:৪৯ পিএম

ঢাকা : মহামারী করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চলমান লকডাউনের মধ্যেও ঈদে বাড়ি গেছেন লাখো মানুষ।  ঈদ আনন্দ উপভোগ শেষে শেষে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলার কর্মস্থলে ফিরছেন মানুষ।

গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যান, পণ্যবাহী ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙে ভেঙে রাজধানীতে ফিরছেন তারা। এতে খরচ পড়ছে কয়েকগুণ। কড়া রোদে ভোগান্তির মাত্রাও বেড়েছে অনেক।

গত চার দিনের মতো বুধবারও দেশের বিভিন্ন ঘাটে ও মহাসড়কে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। তবে গত কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল ঢাকামুখী মানুষের চাপ অনেকটা কম ছিল। তার পরও যারা ফিরছেন তাদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে গুনতে হচ্ছে কয়েকগুণ বাড়তি টাকা। রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন কামাল নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী। তার সঙ্গে ছিন স্ত্রী আর তিন বছর বয়সি মেয়ে।

তিনি বলেন, এত কষ্ট করে জীবনে কোনো দিন যাতায়াত করিনি। বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা থাকেন। যে কারণে দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ঈদে বাড়ি যেতে হয়েছিল।

তখনো বেশ কষ্ট হয়েছিল, তবে ফেরার পথে কয়েকগুণ বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। জীবিকার তাগিদে ফিরতে হবে, তাই এমন কষ্ট করে

ঢাকায় ফিরলাম। আমাদের মতো লাখ লাখ মানুষ এভাবে ভোগান্তির শিকার হয়ে ঢাকায় ফিরছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভাড়ায়চালিত প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসে করেও ঢাকায় আসছেন যাত্রীরা। ট্রাফিক পুলিশের বাধা পাওয়ার ভয়ে চালকরা যাত্রীদের আমিনবাজার ব্রিজের আগেই নামিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আবার কিছু চালক ঢাকায় প্রবেশের আগে যাত্রী নামিয়ে খালি গাড়ি নিয়ে ঢাকায় ঢুকছেন। এতে ভোগান্তিতে পড়েন দূর দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা।

হাবিবুর রহমান নামে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বগুড়া থেকে স্ত্রী ও এক সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ফিরেছেন। কিন্তু তাকেও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে আমিনবাজার ব্রিজের অনেক আগেই। সেখান থেকে তিনি ও তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে হেঁটে এসেছেন। সঙ্গে আছে কাপড়ের ব্যাগ।

তিনি বলেন, বগুড়ার একটি ফেসবুক পেজে ঢাকা যাওয়ার মাইক্রোবাসের সন্ধান পাই। তখন তারা বলেছিল ৮ জন যাত্রী হয়ে গেছে। আপনাদের দুটি সিট দেওয়া যাবে। ভাড়া পড়বে ২ হাজার টাকা করে। এর পর ওই গাড়িতে করে এসেছি। কিন্তু তারা ঢাকায় না ঢুকে আগেই আমাদের নামিয়ে দিয়েছে। বাকি পথ আমরা হেঁটে এলাম। এ ছাড়া পুরো পথেই ছিল নানা ভোগান্তি।

রাজশাহী থেকে আসা একটি মাইক্রোবাসের চালক আলতাব হোসেন বলেন, আমার গাড়ি ঢাকার মিরপুর এলাকার। রাজশাহী থেকে ঢাকা আসার একটি ট্রিপ পেয়ে রাজশাহী গিয়েছিলাম গতকাল রাতে। আজ সাতজন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় এসেছি।

কিন্তু ট্রাফিক সার্জেন্ট ঝামেলা করে, তাই যাত্রীদের আমিনবাজার ব্রিজের আগে নামিয়ে দিয়ে ফাঁকা গাড়ি নিয়ে ঢুকলাম। পুরো গাড়িটির ভাড়া ছিল ১৮ হাজার, যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে ভাড়া দিয়েছেন আমাকে। আজ আবার বগুড়া যাব, সেখানে রাতে ট্রিপ আছে ঢাকায় আসার। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস দূরপাল্লার ট্রিপ দিচ্ছে। তবে অন্য সময়ের চেয়ে ভাড়া কিছুটা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে গত তিন দিনে ঢাকায় প্রায় ২৩ লাখ মানুষ প্রবেশ করেছেন বলে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। এর মধ্যে গত সোমবার  এক দিনেই প্রবেশ করেছেন ১২ লাখের বেশি মানুষ। ঢাকা ছেড়ে যাওয়া এবং ফেরত আসা মানুষের মোবাইল অপারেটরের তথ্যভান্ডার ও কল প্রবণতা বিশ্লেষণ করে গত মঙ্গলবার তিনি এ কথা জানান তিনি।

ঈদ শেষে ঢাকামুখী যাত্রীদের ভোগান্তি, ভাড়া নৈরাজ্য ও গাদাগাদি করে যাতায়াতের কারণে করোনার ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ সাপেক্ষে গণপরিবহন চালুর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বিবৃতিতে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত লকডাউনে দূরপাল্লার বাস সার্ভিস বন্ধ।

এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ট্রাক-পিকআপে গাদাগাদি করে, কেউবা শত শত মাইল পায়ে হেঁটে ঢাকায় ফিরছেন। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সাপেক্ষে জরুরি ভিত্তিতে আন্তজেলা ও দূরপাল্লার নন-এসি বাস সার্ভিস চালু করা হলে যাত্রীদের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমবে।

তিনি বলেন, গতকাল রংপুর থেকে বের হয়েছি। ভেঙে ভেঙে আমাদের আসতে হয়েছে। প্রথমে লোকাল বাসে রংপুর থেকে বগুড়া এসেছি। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইল। এর পর সিএনজিচালিত অটোরিকশা, আবার বাস, কিছু পথ হেঁটে এভাবেই কোলে ছোট্ট সন্তান, স্ত্রী আর ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে ঢাকায় আসলাম। খুব ভোগান্তি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে রাজধানীর গাবতলী সংলগ্ন আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে দলে দলে মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যাত্রীদের ব্রিজের অনেক আগেই নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর যাত্রীরা হেঁটে এ পথ পার হয়ে আন্তনগর বাসে করে ঢাকার যার যার গন্তব্যে যাচ্ছেন।

মাথায় একটি বস্তা, হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে হেঁটে আমিনবাজার ব্রিজ পেরিয়ে আসছিলেন জহুর আলী নামে এক গার্মেন্টস কর্মী। তিনি বলেন, দিনাজপুর থেকে আসলাম। যেহেতু দূরপাল্লার বাস চলছে না তাই একটি কোম্পানির গাড়িতে কয়েকজনের সঙ্গে চাপাচাপি করে এসেছি। কিন্তু পুলিশের বাধার কারণে অনেক দূরে নামিয়ে দিয়েছে। ভাড়া নিয়েছে ১৩০০ টাকা। এরপর বাকি পথ হেঁটে এলাম।

সোনালীনিউজ/এমটিআই