সংসারে শান্তি আনতে স্বামী-স্ত্রীর করণীয়

  • ধর্মচিন্তা ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬, ০৯:২০ এএম

ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ কেবল দুজন মানুষের সামাজিক বন্ধন নয়; বরং এটি ভালোবাসা, মমতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক পবিত্র সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য শান্তি ও প্রশান্তির কারণ হবে—এটাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে আছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। ’ (সুরা : রোম, আয়াত : ২১)

সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন গড়ে তুলতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই কিছু দায়িত্ব ও উত্তম গুণ থাকা প্রয়োজন। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাদের আচরণের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো।

স্বামীর যে গুণগুলো থাকা প্রয়োজন

 

১. পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া

ইসলাম স্বামীকে পরিবারের দায়িত্বশীল হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তাই স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের প্রয়োজনের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তার কর্তব্য।

আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষরা নারীদের দায়িত্বশীল। কেননা আল্লাহ তাদের একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৪)

২. স্ত্রীর সঙ্গে কোমল ও সদাচরণ করা

স্ত্রীর সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা একজন মুমিন স্বামীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। দাম্পত্য জীবনে কঠোরতা নয়, বরং ভালো কথা, সম্মান ও কোমল আচরণ সম্পর্ককে দৃঢ় করে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সত্ভাবে জীবনযাপন কোরো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)

৩. ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া

দাম্পত্য জীবনে একে অপরের কিছু আচরণ কখনো অপছন্দনীয় মনে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাগ, অবজ্ঞা কিংবা ঘৃণার পরিবর্তে ধৈর্য ধারণ করা এবং সুন্দরভাবে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।

আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের সঙ্গে সত্ভাবে জীবনযাপন করবে; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ করো তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

৪. বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা

স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, তার সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা এবং পারিবারিক বিষয়ে ইনসাফ করা স্বামীর দায়িত্ব। সন্দেহ, অপমান, অন্যায় কিংবা রাগের বশবর্তী হয়ে আচরণ করা ইসলামের আদর্শ নয়।

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যর্পণ করতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

৫. ভালোবাসা ও স্নেহ প্রকাশ করা

শুধু পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন পূরণ করাই স্বামীর দায়িত্বের শেষ নয়। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা, তাকে সময় দেওয়া, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং আন্তরিকতা প্রকাশ করাও দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ভালোবেসে কখনো কখনো আমার নাম হুমায়রা বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন।(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)

স্ত্রীর যে গুণগুলো থাকা প্রয়োজন

 

১. পরিবার ও স্বামীর প্রতি যত্নশীল হওয়া

একজন স্ত্রী পরিবারের শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বামীর প্রতি যত্ন, সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন এবং পরিবারের পরিবেশ সুন্দর রাখার বিষয়ে তার সচেতন থাকা উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আর নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং সে এই ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৫৪)

২. স্বামীকে সম্মান করা ও বৈধ বিষয়ে আনুগত্য করা

ইসলাম স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বৈধ কাজে তার আনুগত্যের শিক্ষা দিয়েছে। তবে এ আনুগত্য ইসলামের বিধানের বিরোধী কোনো কাজে নয়।

হাদিসে এসেছে, ‘আমি যদি কোনো মানুষকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম, তবে স্ত্রীদের আদেশ দিতাম তাদের স্বামীদের সিজদা করতে। কেননা আল্লাহ স্ত্রীদের ওপর স্বামীদের অধিকার দিয়েছেন।’(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১৪০)

হাদিসবিশারদরা বলেন, এখানে স্বামীর মর্যাদা ও আনুগত্যের অধিকার বোঝানো উদ্দেশ্য।

৩. স্বামীর অনুপস্থিতিতে আমানত রক্ষা করা

স্বামী যখন বাইরে থাকেন, তখন স্ত্রী তার নিজের সম্ভ্রম, স্বামীর সম্পদ, সন্তান ও পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবেন। পরিবারের আমানত ও নিজের মর্যাদা রক্ষা করা একজন নেককার স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

আল্লাহ বলেন, ‘সৎ নারীরা অনুগত এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে আল্লাহ যা সংরক্ষণ করতে বলেছেন তা সংরক্ষণ করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৪)

৪. ধৈর্যশীল ও ক্ষমাশীল হওয়া

সংসার জীবনে মতপার্থক্য বা ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে। তাই ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে না দেখে ধৈর্য, ক্ষমা ও সুন্দর কথাবার্তার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত। অল্পে তুষ্ট থাকা ও ধৈর্য ধারণ করা মুমিন নারীর প্রশংসনীয় গুণ।

এক নারী তার ব্যক্তিগত একটি অসুবিধার কথা জানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে দোয়া চাইলে তিনি বলেন, ‘তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ করতে পারো, বিনিময়ে জান্নাত পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৬৫২)

৫. ভালোবাসা, হাসিমুখ ও আন্তরিকতা বজায় রাখা

স্ত্রীর হাসিমুখ, আন্তরিকতা ও স্নেহ দাম্পত্য জীবনে প্রশান্তি এনে দেয়। স্বামীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা এবং পরিবারের প্রতি আন্তরিক থাকা সংসারের সৌন্দর্য বাড়ায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুমিন আল্লাহভীতির পর উত্তম, যা লাভ করে তা হলো পুণ্যময়ী স্ত্রী। স্বামী তাকে কোনো নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে; সে তার দিকে তাকালে (তার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্লতা) তাকে আনন্দিত করে এবং সে তাকে শপথ করে কিছু বললে সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার সম্ভ্রম ও সম্পদের সংরক্ষণ করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৫৭)

পারস্পরিক আচরণেই গড়ে ওঠে সুখী সংসার

স্বামী-স্ত্রীর কেউই একা একটি সুন্দর সংসার গড়ে তুলতে পারে না। পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা ও বিশ্বস্ততার সমন্বয়েই দাম্পত্য জীবন শান্তিময় হয়। তাই নিজের অধিকার নিয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অপরের অধিকার ও দায়িত্বের প্রতিও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে উভয়ে যদি একে অপরের প্রতি সদাচরণ করে, তাহলে তাদের সংসার ভালোবাসা ও প্রশান্তির আবাসে পরিণত হতে পারে।

এম