বিশ্ব শিশু দিবস আজ

করোনার প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত হচ্ছে শিশুরা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২১, ১২:৪৫ এএম

ঢাকা : কোভিড-১৯-এর কারণে কাজ হারিয়েছে বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবি মানুষ। বাবা-মায়ের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে এরই মধ্যে ঢাকাসহ অন্যান্য শহর ছেড়েছে বহু শিশু।

অর্থনৈতিক দুর্দশার শিকার হয়ে কাউকে কাউকে বই-খাতা ছেড়ে বসতে হয়েছে বিয়ের পিঁড়িতে, কেউ কেউ যাচ্ছে কলকারখানায়, কেউ গাড়ির হেলপারি করছে।

ইতোমধ্যে শিশুশ্রমে নিযুক্ত শিশুদের হয়তো দৈনিক আরও দীর্ঘ সময় ধরে বা আরও খারাপ অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এমন একটি সময়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু দিবস।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে যাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বা বিবিএস এর ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার সার্ভে ২০২১ জরিপে দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিয়োজিত রয়েছে এবং তাদের কাজের ধরণ জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ হুমকিস্বরূপ।

এতে বলা হয়েছে বাংলাদেশে যে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে তার প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুর কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে এবং বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনসাপেক্ষ । জরিপে বলা হয়েছে দেশের মধ্যে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা সব থেকে বেশি ঢাকা বিভাগে যা প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ এবং এর পরেই চট্টগ্রামে রয়েছে ৫.৮ শতাংশ শিশু শ্রমিক। দেশের মধ্যে শিশুশ্রম সব চেয়ে কম বরিশালে ১.৭ শতাংশ।

শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমকে নির্ধারণ করে ২০২৫ সালের মধ্যে সেগুলোকে বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছে। তবে গত জুন মাসে বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়েছে করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের দরিদ্র ও হত দরিদ্র পরিবারের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ফিরে যাচ্ছে৷।

সংস্থাটির ওই জরিপে অবশ্য এমন চিত্র উঠে আসলেও সারাদেশে করোনা মহামারির কারণে ঝুঁকি পূর্ণ শিশু শ্রমের সংখ্যা কতটা বেড়েছে তার উল্লেখ নাই ৷ গত জুন মাসে জাতিসংঘও জানিয়েছে করোনা মহামারি ও লক ডাউনের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ব ব্যাপীই শিশু প্রমিকের সংখ্যা গত এক বছরে বেড়েছে প্রায় ১ কোটি।

মহামারির মাঝে গত মার্চ ২০২০ থেকে স্কুল বন্ধ থাকা এবং দরিদ্রতা বৃদ্ধি আরও অনেক শিশুকে শিশুশ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোযুমি বলেন, এই পরিস্থিতিতে পরিবারগুলোর বেচে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে এবং তার জন্য তারা সকল পন্থাই অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই আমাদের এখন শিশুদের প্রয়োজনগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং এই ক্ষতিকারক শিশুশ্রমের মূলে যে সকল সামাজিক সমস্যাগুলো রয়েছে তা নিরসনে জোর দেয়া প্রয়োজন।

গত জানুয়ারির মাঝামাঝিতে প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচের অন্তর্র্বতীকালীন প্রতিবেদন-২০২১ এ ঝরে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগজনক মতামত পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকের ৩৮ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন বিদ্যালয় খুলে দেয়ার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যেতে পারে। ২০ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে এবং ৮.৭ শতাংশ মনে করেন, শিক্ষার্থীরা শিশুশ্রমে নিযুক্ত হতে পারে।

মাধ্যমিকের ৪১.২ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে পারে। ২৯ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে। ৪০ শতাংশ অভিভাবক মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতির হার বাড়বে এবং ২৫ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে।

৪৭ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনে করেন শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতের হার বাড়বে, ৩৩.৩ শতাংশ মনে করেন ঝরে পড়া বাড়বে এবং ২০ শতাংশ মনে করেন অনেকেই শিশুশ্রমে যুক্ত হতে পারে। ৬৪ শতাংশ এনজিও কর্মকর্তা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার ও ঝরে পড়া বাড়বে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, পরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য কী পরিমাণ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, তা বের করতে হবে। এটা পুনরুদ্ধারে শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষার অর্জনগুলো ধরে রাখতে হবে। শিক্ষার জন্য দরকার একটা প্রণোদনা প্যাকেজ। তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের জন্য বিকল্প পাঠের ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, যে সময় শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, ঠিক সে সময় এক শ্রেণির শিশু পেটের দায়ে বা অভাবের তাড়নায় শ্রম বিক্রি করে। এটা খুবই বেদনাদায়ক।

প্রত্যেক শিশুরই ছেলেবেলার অধিকারগুলো প্রাপ্য এবং তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং সকল নাগরিকের দায়িত্ব। শিশুশ্রম বন্ধ হওয়া দরকার বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন এটা সকলকে মনে রাখতে হবে যে শিশু শ্রম নিরসনে সকলকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই