• ঢাকা
  • বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

জমজমাট প্রাচীন লোকোৎসব চড়ক মেলা


নাটোর প্রতিনিধি এপ্রিল ১৫, ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
জমজমাট প্রাচীন লোকোৎসব চড়ক মেলা

মঙ্গল কামনা ও রোগব্যাধি থেকে মুক্তির আশায় অনুষ্ঠিতব্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন লোকোৎসব চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে নাটোরের শংকরভাগ গ্রামে শুরু হয়েছে দু’দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী চড়ক মেলা। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত।

নাটোর শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরের শংকরভাগ গ্রামজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজিত এ মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমিয়েছেন। মনের বাসনা পূরণ ও রোগমুক্তির আশায় অনেকে পূজা-অর্চনার পাশাপাশি ফল, হাঁস-মুরগি ও ছাগল মানত করছেন।

মঙ্গলবার দুপুর থেকেই শংকরভাগ গ্রামের স্কুল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের পদচারণায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা—এ যেন সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

স্থানীয় বাসিন্দা খগেন্দ্রনাথ রায় জানান, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এ এলাকায় চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন এখনও তার নিজস্বতা ধরে রেখেছে। তবে আগের মতো আদিবাসীদের নৃত্য এখন আর চোখে পড়ে না। চড়ক গাছে বর্শি বা বড়শি ফুঁড়িয়ে সন্ন্যাসীদের ঘোরানোই এই পূজার মূল আকর্ষণ।

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, একসময় এ এলাকায় আদিবাসীদের বসবাস ছিল বেশি। কিন্তু নানা কারণে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। তারপরও প্রতিবছর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্থানীয়রা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

মেলাকে ঘিরে বসেছে নানা পসরা। চিনি-গুড়ের জিলাপি, মুড়ি-মুড়কি, কদমা, হাওয়াই মিঠাই, মহিষের দুধের ঘোল ও পেঁয়াজুর দোকানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া নারীদের জন্য কাঁচের চুড়ি, টিপ, সিঁদুর এবং গৃহস্থালির বিভিন্ন লোহার ও কাঠের তৈরি সামগ্রীও বিক্রি হচ্ছে।

মেলায় আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন মানত। নলডাঙ্গার গীতা রানী তার শিশুর রোগমুক্তির জন্য মানত করেছেন। নাটোর শহরের দিপালী রায় স্বামীর সুস্থতার আশায় পূজা দিতে এসেছেন। পাবনার অধরা পাল দীর্ঘদিন সন্তানের আশা নিয়ে এই চড়কে মানত করতে এসেছেন।

শংকর ভাগ এলাকার প্রবীণ বিমল সাহা জানান, আগে চড়ক পূজায় আরও কঠোর নিয়ম পালন করা হতো। সন্ন্যাসীরা আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটতেন, ধারালো অস্ত্রের ওপর দাঁড়াতেন—তবুও তাদের কোনো ক্ষতি হতো না বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে বর্তমানে সেই কঠোরতা অনেকটাই কমে এসেছে।

পূজা আয়োজকরা জানান, চৈত্রসংক্রান্তির সকালে পুকুরে রাখা চড়ক গাছ তুলে এনে পরিষ্কার করে পূজা শেষে প্রস্তুত করা হয়। এরপর সন্ন্যাসীদের পিঠে বড়শি ফুঁড়িয়ে চড়ক গাছে বেঁধে ঘোরানো হয়। এ সময় অভিভাবকরা সন্তানদের শূন্যে তুলে ধরেন এবং সন্ন্যাসীরা তাদের আশীর্বাদ করেন।

শংকরভাগ চড়ক পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি হারান চন্দ্র গোস্বামী জানান, এ বছর ২৩ জন সন্ন্যাসীকে বর্শি ফোঁড়ানো হয়েছে। ২১ সদস্যের একটি কমিটি মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনা করছে। প্রথম দিন পূজা ও বর্শি ফোঁড়ানো এবং দ্বিতীয় দিন গান-বাজনার মধ্য দিয়ে উৎসব উদযাপন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, চড়ক পূজা বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও প্রচলিত একটি প্রাচীন লোকোৎসব, যা চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে শুরু হয়ে বৈশাখের প্রথম কয়েকদিন পর্যন্ত চলে।

নাটোর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ আদনান বলেন, “ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এফতেখায়ের আলম জানান, “মেলায় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।”

সব মিলিয়ে, শংকরভাগের চড়ক মেলা শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি এখন গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

Link copied!