• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

বিশ্ব অর্থনীতির নতুন চাপে বাংলাদেশ, সামনে ঋণ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ


আবদুল হাকিম, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০২:৫০ পিএম
বিশ্ব অর্থনীতির নতুন চাপে বাংলাদেশ, সামনে ঋণ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ

ছবি : প্রতিনিধি

ঢাকা: বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই পরিবর্তনে আমদানি ব্যয়, রপ্তানি বাজার, বৈদেশিক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা, ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফের আলোচনায় উঠে আসা এসব বিষয় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

আইএমএফের ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতি-সংক্রান্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। সংস্থাটির তখনকার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ

বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং পরিবহন, উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খরচের মাধ্যমে বাজারদরেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার ও সরকারি ঋণপত্রের মুনাফা বেশি থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদেশি অর্থায়ন সংগ্রহ ব্যয়বহুল হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঋণ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রপ্তানি ও বিনিয়োগে নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিভাজন, প্রধান বাজারগুলোর নীতিগত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার ওঠানামা এ খাতের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানি শিল্পেও প্রভাব ফেলতে পারে। আবার এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা গেলে বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও নীতির ধারাবাহিকতা, আর্থিক খাতের সুশাসন, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের বাংলাদেশ মূল্যায়নেও রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, সুশাসন জোরদার এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এআই: ঝুঁকি, আবার সম্ভাবনাও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উৎপাদন, ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি না হলে কিছু প্রচলিত কাজের চাহিদা কমে যেতে পারে।

বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ জরুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে উৎপাদনশীলতা ও বাজার সম্প্রসারণেও সহায়তা মিলতে পারে।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান কাজ হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। এ জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর জোর দিতে হবে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও কার্যকর নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তার অভিঘাত কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের জন্য এটাই হবে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার বড় পরীক্ষা।

এএইচ/পিএস

Link copied!