• ঢাকা
  • শনিবার, ০২ মার্চ, ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জোটের ভোটে দৌড়ঝাঁপ


নিজস্ব প্রতিবেদক ডিসেম্বর ৬, ২০২৩, ১২:২১ পিএম
জোটের ভোটে দৌড়ঝাঁপ

ঢাকা : জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের শরিক ১৪ দলকে নিয়ে নির্বাচনি লড়াইয়ে নামতে চায় ক্ষমতাসীনরা।

এর বাইরে দুই বারের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, একাধিক রাজনৈতিক দল, ধর্মভিত্তিক ইসলামি দল এবং জোটকেও সঙ্গী করতে চায় তারা। এক্ষেত্রে কোথাও প্রকাশ্যে আবার কোথাও অপ্রকাশ্যে পর্দার অন্তরালে আসন সমঝোতার পথে হাঁটতে দেখা যেতে পারে আওয়ামী লীগকে।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই দীর্ঘদিন পর ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

সোমবার (৪ ডিসেম্বর) গণভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে শরিক দলকে নিয়েই ভোট করার বিষয়ে আস্বস্ত করেন তিনি। এ সময় আসন সমঝোতা প্রশ্নে আলাপ-আলোচনার জন্য আওয়ামী লীগের চার শীর্ষ নেতাকে দায়িত্ব দেন।

এরই অংশ হিসাবে মঙ্গলবার ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমুর ইস্কাটনের বাসায় বৈঠক করেন জোট নেতারা।

জানা গেছে, এই বৈঠকে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এজন্য নেতারা আরও সময় প্রয়োজন বলে মনে করছেন। ফলে ১৪ দলের প্রার্র্থীদের পুরোপুরি ভোটে নামতে আরও কিছুদিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, এর বাইরে দুবারের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গেও নেপথ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে আওয়ামী লীগের। আজকালের মধ্যে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসবেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বৈঠক শেষে ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু বলেন, ১৪ দল জোটগতভাবেই নির্বাচন করবে।

তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে যুদ্ধ করার বিষয়ে ১৪ দল পরীক্ষিত। এটা শুধু আসন বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে না। আমরা একটি আদর্শিক রাজনৈতিক জোট। এটা অন্যদের মতো ভাগাভাগির জোট নয়। আমরা ২০০১ থেকে যুদ্ধ করে এসেছি। ২০০৬ সালে যুদ্ধ করেছি। আসন বিন্যাস বা কে কি পেল না পেল-এটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো আমরা আছি, কাজ করছি।

শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা এবং সমঝোতা হওয়া আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের থাকা না থাকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সব আনসার্টেন্ট। কারণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই তো আওয়ামী লীগের প্রার্থী আছে। ফলে কে থাকবে কে, থাকবে না, কে প্রত্যাহার করবে কে করবে না, এগুলো এখনই বলা যাচ্ছে না। আসন বিন্যাসের ঘোষণা হয়তো আগে হতে পারে কিন্তু মূল বিষয়ের জন্য আরও অপক্ষো করতে হবে। এছাড়া জাতীয় পার্টি আছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা হবে। তাদের আসন বিন্যাস হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিসহ তাদের বলয়ে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মধ্যে এবারের নির্বাচনে যারা অংশ নিচ্ছেন, তাদের অনেকেই নানাভাবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে থাকতে চাইছেন। কেউ প্রকাশ্যে জোটে থেকে, আবার কেউ অপ্রকাশ্যে আসন সমঝোতার আশায় রয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় করে তুলতে বেশি আগ্রহী। এ কারণে তারা দল মনোনীত প্রার্থীর বাইরেও যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন-তাদের মাঠ থেকে সরে দাঁড়াতে বলবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

অনেকটা এ কারণে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে হতাশাও বিরাজ করছে। ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দিনক্ষণ মিলিয়ে দেখলে ভোটের আর মাত্র ৩১ দিন বাকি। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা পুরোদমে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলের বাইরেও ক্ষমতাসীনদের অসংখ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের মাঠে গরম হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাদের শরিকরা এখনো অন্ধকারে। কোন দলের কোন প্রার্থী কোন আসন থেকে নির্বাচন করবেন এখনো অজানা। দলীয় নাকি নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটের ময়দানে নামবেন তাও জানেন না শরিক দলের নেতারা। তাই এখনো হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন তোপখানা-পল্টন-বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থিত তাদের ছোট ছোট কার্যালয়ে।

এদিকে ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোটের বাইরেও আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল সমঝোতার জন্য আওয়ামী লীগের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে ইসলামি দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করেই নির্বাচন করতে চায়। ২৩ নভেম্বর গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন নয়টি ইসলামি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ১৪ নেতা।

এছাড়া ৩০ নভেম্বর গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন খেলাফতে রাব্বানী বাংলাদেশ এবং নেজামে ইসলাম পার্টি বাংলাদেশের মুফতি ফয়জুল হক জালালাবাদী ও মাওলানা আনওয়ারুল হক। নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ইসিতে নিবন্ধিত ইসলামি বা ইসলামি ভাবধারার ১১টি দলের মধ্যে ভোটের মাঠে আছে সাতটি দল।

দলগুলো হলো-বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ), ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি), ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার), জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা)। যাচাই-বাছাইয়ের পর এখনো দলগুলোর ৪৪৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে আছেন।

এর মধ্যে রয়েছেন- ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের ৩৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোটের ৪৩ জন, খেলাফত আন্দোলনের ৯ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ৩৬ জন, তরিকত ফেডারেশনের ৪১ জন, জাকের পার্টির ২০৮ জন, সুপ্রিম পার্টির ৭১ জন।

এছাড়াও নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট শরিকদের মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ৯১, জাতীয় পার্টি-জেপি ২০, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল) ৬, গণতন্ত্রী পার্টি ১২, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ ৬, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ৩৩, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ৪৭টি আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের মহাজোটের শরিক দল বিকল্পধারা বাংলাদেশ ১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা গত তিনটি (নবম, দশম ও একাদশ) সংসদ নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে ভোটে অংশ নেয়। বিকল্পধারা বাংলাদেশ গত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে।

এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাতটি ইসলামি দলের মধ্যে শুধু তরিকত ফেডারেশনের গত দুটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছিল। তরিকত ফেডারেশন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নিয়েই তারা অংশ নিয়েছিল। এবারও দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী নৌকা নিয়ে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের কাছে আসন চেয়েছেন।

এর বাইরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ইসলামি দলগুলোও আওয়ামী লীগ বা সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসাবেই পরিচিত। এসব দল বিভিন্ন আসনে প্রার্থী দিলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া তাদের প্রার্থীদের জেতার সম্ভাবনা খুব কম। ফলে এসব দলের নেতারাও তাকিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের দিকে। নানাভাবে চেষ্টা করছেন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করতে।

নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন একটি দলের নেতা বলেন, আমরা সমঝোতা করেই নির্বাচন করতে চাই। যদিও এখনো বলার মতো অগ্রগতি নেই। তবে আশা করছি এটা হবে।

আওয়ামী লীগ এবারের ভোটও জোটগতভাবে করবে-এমনটা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আগেই জানিয়েছিল। এতে করে নৌকার ওপর ভর করে গত তিনটি (নবম, দশম ও একাদশ) নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসা ১৪ দলের নেতারা বেশ স্বস্তিতে ছিলেন। তারা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জোট নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য বারবার তাগাদাও দিচ্ছিলেন।

অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সোমবার (৪ ডিসেম্বর) রাতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা। নানা বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা আর ভূরিভোজ শেষে যে যার ঘরে ফেরেন অনেকটাই শূন্য হাতে।

১৭ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপরপরই প্রতীক বরাদ্দ। শুরু হবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা। শরিকরা চান এর আগেই আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হোক। বিশ্লেষকদের মতে সমঝোতা হবে। কিন্তু সেটা কতটা স্বস্তির হবে, শরিকরা কত আসন পাবেন সেটাই দেখার অপেক্ষা। সূত্র : যুগান্তর

এমটিআই

Wordbridge School
Link copied!