• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কূটনীতিতে তৎপর পাকিস্তান, প্রভাব হারাচ্ছে ভারত?


আন্তর্জাতিক ডেস্ক এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৫:১৯ পিএম
ইরান যুদ্ধ নিয়ে কূটনীতিতে তৎপর পাকিস্তান, প্রভাব হারাচ্ছে ভারত?

ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সঙ্কটে পাকিস্তান যখন নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির করছে, ভারত কি তখন পাশে পড়ে থাকছে না? দিল্লিতে যে এ নিয়ে বেশ ফিসফাস চলছে তা একপ্রকার নিশ্চিত।

মধ্যপ্রাচ্যের যে যুদ্ধ বিশ্বকে তুমুল অর্থনৈতিক সঙ্কটের ঝুঁকিতে ফেলেছে সেখানে ইসলামাবাদ অস্বাভাবিক চটপটে ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দিনকয়েক আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাবও দিয়েছিল, তবে তেহরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। চলতি সপ্তাহেও পাকিস্তানকে ফের অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা যায়; যুদ্ধ বন্ধে ৫ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনায় চীনের সমর্থন চাইতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফরে যান।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সবচেয়ে বড় প্রতিবেশীর এমন উত্থান ভারতের চোখে অস্বস্তিকরই হওয়ার কথা, বলছে বিবিসি।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়া দিল্লির সম্পর্ক যখন অমসৃণ পর্ব পার করছে, সেসময় পাকিস্তান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চ্যানেল পুনঃস্থাপনে মত্ত—এ বোধাদয় থেকে দিল্লির অস্বস্তি আরও তীব্রতর হয়েছে।

এমন পরিস্থিতি কৌশল নিয়ে কাজ করা ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করেছে, যেমনটা আগেও দেখা গেছে।

দেশটির কিছু বিরোধী দল ও অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, এ অঞ্চলে ভারতের যে বহুমুখী সম্পর্ক রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে কোনো ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ ছিল কিনা, দিল্লির তা খতিয়ে দেখা দরকার ছিল। তেমনটা হলে ভূ-রাজনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারতকে অনুপস্থিত মনে হত না।

বিরোধী দল কংগ্রেস সরকারকে আক্রমণের নিশানা বানিয়ে বলেছে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের আবির্ভাবের খবর ভারতীয় কূটনীতির জন্য ‘লজ্জাজনক’।

কৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি এক্সে বলেছেন, “বয়ানের লড়াইয়ে অধিকতর তৎপর ও আক্রমণাত্মক হওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান প্রায়ই কূটনৈতিকভাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যায়।”

তবে অনেক বিশ্লেষক আবার মনে করে, কেবল দৃশ্যমান হওয়ার উদ্দেশ্যে এমন কোনো ভূমিকায় থাকার প্রয়োজন নেই। আমন্ত্রণ বা যথেষ্ট প্রভাব ছাড়া মধ্যস্থতা করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে বলে তারা সতর্কও করছেন।

নীরব কূটনীতি ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমেই ভারতের স্বার্থ ভালোভাবে হাসিল হবে, মত তাদের।

ভারত সরকারের অবস্থানও অনেকটা এমন-ই। গত সপ্তাহে এক সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকাকে ‘দালালি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাপিমন জ্যাকব মনে করেন, ভারতের মধ্যস্থতা সংক্রান্ত বিষয়ে কৌশল যতটা না বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মনস্তত্ত্ব।

“ভারতে যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা এক ধরনের ‘প্রতিযোগিতামূলক উদ্বেগ’ থেকে জন্মানো, পাকিস্তান পারলে আমরা কেন নয়! এটা বড়জোর পিছিয়ে পড়ার ভয় অথবা ছোট প্রতিবেশীর প্রতি এক ধরনের ঈর্ষা, তারা এমন মনোযোগ পাচ্ছে যা আমাদের কৌশলগত মহলের মতে ভারতেরও পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পিছিয়ে পড়ার ভয় বা ঈর্ষা কোনো ভালো বিদেশনীতির ভিত্তি হতে পারে না,” এক নিবন্ধে এমনটাই লিখেছেন তিনি।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানও ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে এই ‘জিরো-সাম’ (একজনের লাভে অন্যজনের ক্ষতি) দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করেছেন।

তার মতে, ভারত কখনোই মধ্যস্থতার দৌড়ে ছিল না এবং আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া দিল্লির এতে জড়ানোর সম্ভাবনাও কম।

পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতাও স্বল্পস্থায়ী হবে, এবং কেবল বার্তাবাহকের ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলেও তার ধারণা।

ভারতের বিকল্প ভূমিকা কী হতে পারে?

মধ্যস্থতাকারীর দৌড়ে না থেকে ভারত তাহলে কী ভূমিকা নিতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর ভারতের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বলে মনে করেন পাকিস্তানে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার অজয় বিসারিয়া।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা রাখার সক্ষমতা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নয়া দিল্লির যে সম্পর্ক এবং তার নিজের যে স্বার্থ, তাতে ওয়াশিংটন ভারতকে নিজের ইচ্ছেমতো ‘পরিচালনা’ করতে পারবে না।

“এই কারণেই ভারত মধ্যস্থতাকারীর এই সুনির্দিষ্ট ভূমিকার জন্য অনুপযুক্ত। শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও অর্থপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া দরকার দিল্লির, তবে সেটি পাকিস্তানের মতো করে নয় এবং এখনকার এই পর্যায়েও নয়,” বলেছেন বিসারিয়া।

এই দুই অবস্থানের মাঝে একটি বাস্তবসম্মত মধ্যপন্থাও রয়েছে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও মনে করেন, ভারত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যস্থতায় নামতে না পারলেও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা চলবে না।

“এই যুদ্ধ প্রায় সব দিক থেকেই ভারতের স্বার্থের ক্ষতি করছে। প্রশ্ন হলো, ভারত কি যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে এটি বলতে ইচ্ছুক?” এক্সে বলেছেন তিনি।

ভারতের এই চুপ থাকার নীতি দেশের ভেতরেও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিরোধী নেতারা নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা এবং ইরানে হামলা নিয়ে নীরব থাকার অভিযোগ তুলেছেন।

তাদের মতে, এটি ভারতের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরিপন্থি এবং ইসরায়েলের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার সঙ্কেত।

নিরুপমা রাও বলেন, “সংযমের জায়গা আছে, কিন্তু যখন সার্বভৌমত্ব বা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার মতো মৌলিক প্রশ্ন ওঠে, তখন ভারত নীরব থাকতে পারে না।”

বিসারিয়া মনে করেন, দিল্লির উচিত সংবাদের শিরোনাম হওয়ার কূটনীতি বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী শান্তিস্থাপন প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করা। বিশেষ করে জিম্মি বিনিময়, পর্দার অন্তরালে সামরিক যোগাযোগ রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের মতো বিষয়গুলোতে ভারত ভূমিকা রাখতে পারে।

ওয়াশিংটন কেন ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকছে?

এই বিতর্কের সমান্তরালে এই প্রশ্নও উঠছে, ওয়াশিংটন কেন পাকিস্তানের দিকে ফিরল? লাহোরভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এজাজ হায়দারের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান ও নেটওয়ার্কের মধ্যে। পাকিস্তানই মুসলিম ব্লকের একমাত্র দেশ যার ইরান এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্র, উভয় পক্ষের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে, যা তাদের বার্তা আদান-প্রদানে বিশেষ সুবিধা দেয়।

ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক উমর ফারুক বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক ভূমিকার কারণে তাদের কূটনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। ইয়েমেন থেকে ইরাক ও লেবানন পর্যন্ত ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বেষ্টনীতে থাকা সৌদি আরব এবং তার প্রতিবেশীরা পাকিস্তানের স্থল বাহিনীকে একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে দেখে। এই সামরিক নির্ভরশীলতাই পাকিস্তানকে দরকষাকষির বাড়তি সুযোগ দেয়, যা ভারতের নেই।

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল অবশ্য মনে করেন, পাকিস্তানের এই তৎপরতা নিছক কূটনৈতিক নাটক নয়, বরং এটি তাদের টিকে থাকার লড়াই। তিনি বলেন, “ভারতের মতো এই যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার বিলাসিতা পাকিস্তানের নেই। যুদ্ধ বাড়লে পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করা হবে। তাই ইসলামাবাদের সামনে বিকল্প হলো হয় পরিস্থিতি শান্ত করা, নয়তো একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া।”

পালিওয়ালের মতে, বেইজিং বা ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের প্রভাব খুব বেশি না থাকলেও তাদের এই প্রচেষ্টা বিশ্বের কাছে একটি বার্তা দিচ্ছে যে পাকিস্তান পরিস্থিতি শান্ত করতে ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক। আর এই দৃশ্যমান হওয়ার বিষয়টিই দিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি আর বিশ্ব মঞ্চে গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে দেখানোর তাগিদ এবং বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধনে এক ধরনের ভূমিকা রাখায় নয়া দিল্লির বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক সঙ্কটে দেশটি উপস্থিত থাকবে এমন তাড়নাও তৈরি হয়েছে অনেকের।

যদিও হ্যাপিমন জ্যাকব মনে করেন, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার লাগাম টেনে ধরতে হবে।

“ভারত জলবায়ু ও জ্বালানি খাতে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা দেখাতে পেরেছে; তার মানে এই নয় যে ভারতকে সব কিছুতেই থাকতে হবে। আসল চ্যালেঞ্জ হলো সক্ষমতা ও প্রত্যাশার মধ্যে যে ফারাক তা সামলানো। কী করা দরকার সেই প্রজ্ঞা থাকার পাশাপাশি কী করা ঠিক হবে না তা জানাও অত্যন্ত জরুরি,” বলেছেন তিনি।

এসআই

Wordbridge School
Link copied!