• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১

ছেলের গাড়ি আটকে ঘুষগ্রহণ, রনির স্ট্যাটাসের পর কনস্টেবল প্রত্যাহার


নিউজ ডেস্ক সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৩, ০৬:৪০ পিএম
ছেলের গাড়ি আটকে ঘুষগ্রহণ, রনির স্ট্যাটাসের পর কনস্টেবল প্রত্যাহার

ঢাকা: গত ৩০ আগস্টের ঘটনা। মিরপুর রোড দিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পার হচ্ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম মাওলা রনির বড় ছেলে রিয়াদ। হঠাৎ এক ট্র্যাফিক পুলিশ সদস্য গাড়ি থামান এবং গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে যান। মামলা থেকে বাঁচতে হলে তিন হাজার টাকা ঘুষ চান ওই কর্তব্যরত ট্র্যাফিক পুলিশ সদস্য। তখন টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মামলা দিতে বলেন রিয়াদ। কিন্তু মামলা না দিয়ে তাকে ভর দুপুরে একঘণ্টা গাড়িসহ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরে বাধ্য হয়ে এক হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যান রিয়াদ।

ঘটনার বিশদ বিবরণ তুলে ধরে দুইদিন আগে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন গোলাম মাওলা রনি। তাতে তিনি লিখেছিলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার খোন্দকার গোলাম ফারুক যদি বিষয়টি দেখতেন এবং আমার ছেলের কাছ থেকে আদায় করা ঘুষের এক হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতেন, তবে পুলিশ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস এবং আস্থা অটুট থাকত!

বিষয়টি ডিএমপি কমিশনারের নজরে আসে। তিনি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারকে (ট্র্যাফিক) ঘটনার তদন্ত করতে বলেন। রনির অভিযোগ ও কমিশনারের নির্দেশনায় পরবর্তী সময়ে তদন্তে নামে ট্র্যাফিক রমনা বিভাগ। তদন্তে সেই ট্র্যাফিক পুলিশ সদস্যকে খুঁজে বের করে পুলিশ। তার নাম আশরাফ। তিনি ট্র্যাফিক রমনার নিউ মার্কেট জোনে কর্মরত ছিলেন। তাকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করে ডিসির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে ট্র্যাফিক কনস্টেবল আশরাফের সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে প্রত্যাহার ও তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ট্র্যাফিক রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) জয়নুল আবেদীন।

গত দুইদিন আগে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে গোলাম মাওলা রনি অভিযোগ তুলে লেখেন, বিষয়টি নিয়ে গত রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি! আমার ৩০ বছর বয়সী বড় ছেলে গাড়ি চালিয়ে মিরপুর রোড দিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পার হচ্ছিল! হঠাৎ এক ট্র্যাফিক পুলিশ গাড়ি থামান এবং কাগজপত্র নিয়ে যান! 

ট্র্যাফিক সার্জেন্ট কাগজ পত্র পরীক্ষা করে কোন ত্রুটি খুঁজে না পেয়ে বলতে থাকেন যে গাড়িতে নতুন রিম লাগানো হয়েছে তাই মামলা হবে! মামলা থেকে বাঁচতে হলে তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে! আমার ছেলে মামলা করতে বললে তিনি মামলা না করে ভর দুপুরে একঘণ্টা গাড়িসহ আমার ছেলেকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখেন! পরে এক হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পুলিশের কবল থেকে রক্ষা পায়! 

ঘটনাটি গত ৩০ আগস্ট দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে ঘটে উল্লেখ করে রনি আরও লেখেন, আমি নিজের টাকায় গাড়ি কিনে গত ৩০ বছর ধরে রাজপথে চলছি! কোনোদিন পুলিশের কবলে পড়তে হয়নি! জীবনের সব প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা পেয়েছি এবং একটি পয়সা ঘুষ দিতে হয়নি। তাই পুলিশ নিয়ে আমার যে বিশ্বাস এবং আস্থা ছিল তা গত রাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে! 

আমার গাড়ির সব কাগজপত্র শতভাগ সঠিক! আমার ছেলের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে! ছেলেটি আমার পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং বিশ্ববিখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর সেখানে থেকে যাওয়ার জন্য জিদ করেছিল! আমার ব্যবসার হাল ধরার জন্য অনেক অনুরোধ করে মাস ৬ আগে দেশে এনেছি! 

দেশপ্রেম-দেশের উন্নয়ন এবং দেশ সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক কথা বলে এই প্রজন্মের এক মেধাবী তরুণকে দেশে ফিরিয়ে এনে আমার ৩০ বছরের পুরোনো ব্যবসার হাল তার হাতে তুলে দেওয়ার যে আয়োজন করছিলাম তা এক দুর্নীতিবাজ পুলিশের কারণে পণ্ড হতে যাচ্ছে! 

উল্লিখিত ঘটনায় অপমানিত হয়ে আমার ছেলে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষমেষ ব্যর্থ হয়ে গতরাতে পুরো ঘটনা আমাকে জানায় এবং বিদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়! মাত্র এক হাজার টাকা ঘুষ এবং দুর্নীতিবাজ পুলিশের অবমাননাকর আচরণের জন্য আমার যে অশান্তি এবং অপূরণীয় ক্ষতি হলো তার প্রতিকার আমি কীভাবে পাব! স্ট্যাটাসের শেষে তিনি ডিএমপি কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রতিকার দাবি করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে নিউমার্কেট এলাকায় দায়িত্বরত সব ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট ও কনস্টেবলদের ডেকে পাঠানো হয়। পরে ‍শুনানি করা হয়। গতকাল (মঙ্গলবার) দীর্ঘসময় নিয়ে অভিযুক্তকে শনাক্ত করতে অভিযোগকারী গোলাম মাওলা রনিকে আসতে অনুরোধ করা হয়। 

তিনি বলেন, আজ (বুধবার) গোলাম মাওলা রনি ভুক্তভোগী ছেলেসহ এসে ঘটনায় জড়িত কনস্টেবল আশরাফকে শনাক্ত করেন। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে আমার কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। 

এদিকে ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও শাস্তিতে স্বস্তি এবং ডিএমপি কমিশনারের ভূয়সী প্রশংসা করে আজ (বুধবার) আরেকটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন গোলাম মাওলা রনি। তাতে তিনি লিখেছেন, ছবির ভদ্রলোকের নাম খন্দকার গোলাম ফারুক! তার বর্তমান পদবি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার! তার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই- কোনোদিন কথা হয়নি, এমনকি সামনা সামনি দেখাও হয়নি! কিন্তু তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হতো তার নিকট অভিযোগ করলে ন্যায় বিচার পাব! 

আমার অভিযোগ ছিল -ট্র্যাফিক পুলিশের এক সিপাহি আমার ছেলে রিয়াদের গাড়ি থামিয়ে তার নিকট থেকে এক হাজার টাকা ঘুষ আদায় করেছে। বিষয়টি বিস্তারিত লিখে ১১ই সেপ্টেম্বর, সোমবার দুপুরে আমি আমার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাস দেই!

উল্লিখিত বিষয়টি জনাব ফারুকের নজরে আসে এবং তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন যা পুরো ট্র্যাফিক বিভাগে নজিরবিহীন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে! ঢাকা দক্ষিণ ট্রাফিকের (রমনা ট্র্যাফিক বিভাগ) ডিসি জয়নুল আবেদিন পুরো নিউমার্কেট এলাকায় দায়িত্বরত সব ইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, সিপাহিকে ডেকে পাঠান এবং গতকাল দীর্ঘসময় নিয়ে তাদের সঙ্গে প্রথমে মোটিভেশনাল প্যারেড করেন! তারপর অভিযুক্তকে শনাক্ত করার প্রাথমিক কাজগুলো করে আমাকে ফোন করে তার অফিসে চায়ের দাওয়াত দেন। আজ সকাল ১১টায় আমি আমার ছেলেকে নিয়ে সার্কিট হাউজ সড়কে ঢাকা দক্ষিণ ট্র্যাফিক পুলিশের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে যাই। 

কুশল বিনিময়ের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার জন্য ১৫/১৬ জনের টিমকে আমাদের সামনে আনা হয়, যাদের মধ্যে থেকে আমার ছেলে একজনকে শনাক্ত করে। উপ-কমিশনার জনাব জয়নুল আবেদিন তার কর্মকর্তাদেরকে নিয়ে এবার অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জেরা করে ঘটনার সত্যতা পান এবং তৎক্ষণাৎ দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় শাস্তি প্রদান করেন! 

আপনি যদি উল্লিখিত দৃশ্যটি নিজ চোখে দেখতেন তবে আমার বিশ্বাস ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের বর্তমান নেতৃত্ব সম্পর্কে আপনার ধারণা পাল্টে যেত! 

আমি সম্মানিত পুলিশ কমিশনার জনাব খন্দকার গোলাম ফারুখ সাহেবকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি! তার পুরো টিমকেও ধন্যবাদ এবং দুনিয়া-আখিরাতে তারা যেন মহান আল্লাহর নিকট থেকে উত্তম প্রতিদান লাভ করেন এই দোয়া করছি! 

উপ-কমিশনার জয়নাল আবেদিন এবং এডিসি রানা সাহেব আমার অভিযোগটি নিষ্পত্তি করার জন্য গত দুইদিন ধরে যে শ্রম দিয়েছেন তার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং শুভ কামনা! আল্লাহ হাফেজ!

আইএ

Wordbridge School
Link copied!