‘আল-কুদস’ দিবস হলো বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর জাগরণের দিন ও ফিলিস্তিন মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতীক। এই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনিদের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখে এবং ইসরায়েলের প্রতি মুসলমানদের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চাপা ইহুদি শাসন, শোষণ, নিপীড়ন ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের অবসান ঘটানো এবং বায়তুল মোকাদ্দাসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে দিবসটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আল-কুদস দিবস বা আন্তর্জাতিক আল-কুদস দিবস (ফার্সি: روز جهانی قدس) প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার পালিত হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইরানে শুরু হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনী জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ, জায়নবাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ এবং ইসরায়েল কর্তৃক জেরুজালেম দখলের প্রতিবাদ। জেরুজালেমের অপর নাম ‘কুদস’ বা ‘আল-কুদস’।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইবরাহীম ইয়াজদি সর্বপ্রথম আল-কুদস দিবস র্যালি আয়োজনের ধারণা দেন। এরপর আয়াতুল্লাহ খোমেইনি (রহ.) ১৯৭৯ সালে এটি প্রবর্তন করেন। ইরান সরকার প্রতি বছর আল-কুদস দিবসে প্যারেড আয়োজন করে আসছে। রমজান মাসের আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে মুসলমানরা জাগতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণ অর্জনে এগিয়ে যায়।
ফিলিস্তিন ও বায়তুল মোকাদ্দাস মুক্তি ও ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে আল-কুদস দিবস মুসলমানদের সচেতনতা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির ওপর চেপে থাকা ইহুদিবাদী শাসন, শোষণ ও হত্যাযজ্ঞের অবসান ঘটানো এবং ফিলিস্তিনি জাতির জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও এ দিবসের লক্ষ্য। মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করে বিশ্বব্যাপী ন্যায় ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় এ দিবস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কুদস অর্থ পবিত্র। ‘আল-কুদস’ বলতে বোঝায় জেরুজালেমের পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মোকাদ্দাস। হজরত ইবরাহিম (আ.) কাবা নির্মাণের ৪০ বছর পর তাঁর ছেলে হজরত ইসহাক (আ.)-এর বংশধর হজরত ইয়াকুব (আ.) জেরুজালেমে মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর হজরত সুলায়মান (আ.) এটি পুনর্নির্মাণ করেন।
আদিতে কাবা কিবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা কিবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। নবীজি (সা.) ও সাহাবাগণ পূর্বে উত্তর দিকে অবস্থান করে জামাতে জোহরের নামাজ আদায় করতেন, পরে দক্ষিণ দিকে কাবামুখী হয়ে নামাজ সম্পন্ন করেন। মদিনার মসজিদুল কিবলাতাইন দুই কিবলার প্রতীক। ইসলামের দ্বিতীয় কিবলা হিসেবে বায়তুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কিবলা। হাদিসে আছে, বায়তুল মোকাদ্দাসে নামাজ আদায়ে পঁচিশ হাজার গুণ সওয়াব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মিরাজে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা সফর করেন। এটি নবী–রাসুলদের স্মৃতিবিজড়িত, ইসলামের কেন্দ্র এবং ইসলামী সংস্কৃতির চারণভূমি। হজরত আদম (আ.) কাবা নির্মাণের চল্লিশ বছর পর মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন, হজরত সুলায়মান (আ.) পরে তা পুনর্নির্মাণ করেন।
৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের অধীনে আসে। ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিন দখল করে মসজিদ পরিবর্তন করে। ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে সালাহ উদ্দীন আইয়ুবি মুসলমানদের অধিকারে আনে। ব্রিটিশ ও ইহুদি তৎকালীন ষড়যন্ত্রের কারণে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের মাধ্যমে বায়তুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের হাতছাড়া হয়।
১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লব ফিলিস্তিন ইস্যুর ক্ষেত্রে একটি টার্নিং পয়েন্ট। হজরত ইমাম খোমেইনি (রহ.) মুসলিম উম্মাহকে রমজানের শেষ শুক্রবার ‘আল-কুদস দিবস’ হিসেবে পালন করার আহ্বান জানান। এটি থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি ফিলিস্তিন মুক্তি ও মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশও ফিলিস্তিন মুক্তির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশ ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। চলতি বছর দিবসটি পালিত হবে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের গণহত্যা ও ফিলিস্তিন সমর্থক ইরানের ওপর মার্কিন আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে। মুসলিম বিশ্ব এই দিবসে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শপথ গ্রহণ করবে। আল-কুদস দিবস বিশ্ব শান্তির অন্তরায় ইসরায়েলের প্রতি মুসলমানদের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হোক।
লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail : [email protected]
এসএইচ
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।







































