• ঢাকা
  • বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬,
SonaliNews

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত নিউজ পোর্টাল

অন্ধ আনুগত্যে মেতে ওঠা এসব প্রাণীকে কতটা ‘মানুষ’ বলা চলে?


সাজ্জাদ হোসাইন  জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
অন্ধ আনুগত্যে মেতে ওঠা এসব প্রাণীকে কতটা ‘মানুষ’ বলা চলে?

ফাইল ছবি

আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা সত্য ও ন্যায়ের চেয়ে দলীয় পরিচয় ও মতাদর্শকে বড় করে দেখতে শিখেছি। সত্য যখন নিজের মতের বিরুদ্ধে যায়, তখন দেশের সবচেয়ে সম্মানিত ও গুণী মানুষকেও গালিগালাজ বা চরিত্রহনন করতে আমাদের সামান্যতম দ্বিধা হয় না। আবার নিজের দলের কোনো মারাত্মক অন্যায় বা অপকর্ম ঘটলে তা অস্বীকার করা কিংবা নীরব থাকা যেন এক সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাকে দমিয়ে রাখতে অশ্লীল ভাষার ব্যবহার এবং নেতার চোখ ধাঁধানো চাটুকারিতাই যেন অনেকের একমাত্র যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবেকের এই চরম অবক্ষয়ের যুগে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যুক্তিবোধ ও ভালো-মন্দের বাছবিচার হারিয়ে অন্ধ আনুগত্যে মেতে ওঠা এসব প্রাণীকে কতটা ‘মানুষ’ বলা চলে?

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এমন এক অন্ধ ও নোংরা স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে নীতি-নৈতিকতা বা জনকল্যাণের চেয়ে অন্ধ দলীয় স্বার্থই মূল চালিকাশক্তি। ক্ষমতার মোহ ও অন্ধ আদর্শ মানুষকে এতটা হিংস্র করে তোলে যে, সেখানে প্রতিপক্ষের জীবন বা মানবিক মর্যাদার কোনো মূল্য থাকে না। ইতিহাস সাক্ষী, এই দেশের ও জাতির জন্য যারা জীবনের সেরাটা বিলিয়ে দিয়েছেন, অনন্য অবদান রেখেছেন, তাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে নিজের জীবন দিয়ে। রক্তপাত ও প্রাণনাশের মাধ্যমে এই জাতি বারবার প্রমাণ করেছে যে বিশৃঙ্খলা তাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যেভাবে নিজেদের অপকর্মকে সঠিক বলে সাফাই গেয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে চব্বিশের গণআন্দোলনে শত শত ছাত্র-জনতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও ঘাতক ও তাদের অনুসারীরা নিজেদের অবস্থানকে নির্লজ্জভাবে সঠিক বলে দাবি করে। অপরাধ করে অনুশোচনা তো দূরের কথা, আত্মপক্ষ সমর্থনের এই কুৎসিত প্রবণতা আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক অন্ধকার দিক তুলে ধরে।

বিচক্ষণতার এই অভাব বা চরম বিভাজনের রোগটি কেবল জাতীয় বা সামাজিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; তা ঢুকে পড়েছে আমাদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনচর্চাতেও। আজ এক পারিবারিক আবহে এক ভাই হয়তো সরকারি দল, অন্য ভাই বিরোধী দল, আর বোন বা অন্য কোনো সদস্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি চরম ঘৃণা। রাজনীতির এই বিষাক্ত হাওয়া ভাইয়ে-ভাইয়ে, ভাই-বোনে চির ধরেছে, পরিবারগুলোকে পরিণত করেছে এক একটি ছোট যুদ্ধক্ষেত্রে। যেখানে সবচেয়ে বেশি শান্তি, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা থাকার কথা ছিল, সেই পরিবার ও সমাজ আজ গভীর বিশৃঙ্খলা ও অবিশ্বাসে জর্জরিত। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভেতরেও যে আদর্শিক সংহতি আছে, তা নয়; সেখানেও গ্রুপিং, কোন্দল আর ক্ষমতার লড়াই নিত্যদিনের সঙ্গী।

রাজনীতি ও ক্ষমতার এই কোলাহল থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ যখন একটু মানসিক শান্তি ও আদর্শের খোঁজে ধর্মের আশ্রয়ে যেতে চায়, সেখানেও দৃশ্যপট খুব একটা ভিন্ন নয়। ইসলাম ধর্মসহ প্রায় প্রতিটি ধর্মেই যেখানে ঐক্য, শান্তি ও পারস্পরিক সংহতির প্রতি জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, সেখানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। পবিত্র কোরআনে কঠোরভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যকার বিভাজন আজ চরম রূপ নিয়েছে। এক আলেম অন্য আলেমকে সহ্য করতে পারেন না, সামান্য মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে একে অপরকে কাদা ছোড়াছুড়ি ও অবমাননা করতে পিছপা হন না। সাধারণ মানুষ যাদের অনুকরণীয় ভাববে, সেই ধর্মীয় পথপ্রদর্শকদের ভেতরেই যখন ঐক্যের চরম অভাব দেখা যায়, তখন সাধারণ অনুসারীরা বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পৃথিবীর সকল সৃষ্টির মধ্যে তথাকথিত বুদ্ধিমান জীব হিসেবে মানুষই আজ সবচেয়ে বেশি ভুল, সংঘাত ও বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করছে। অন্ধ দলবাজি, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং অহংকার আমাদের অন্ধ করে দিয়েছে। রাজনীতি থেকে শুরু করে পরিবার ও ধর্মচর্চা—সবখানেই আজ বিভেদের দেওয়াল। এই সামগ্রিক অবক্ষয় ও নোংরা মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের নিজস্ব বিবেক, দয়া এবং সত্যবাদিতাকে জাগ্রত করতে হবে। তা না হলে এই সামাজিক ও জাতীয় বিশৃঙ্খলা থেকে নিস্তার পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।

লেখক:  সাজ্জাদ হোসাইন 
বার্তা সম্পাদক, সোনালী নিউজ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

Link copied!