চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরতে চায় জামায়াত, বিএনপির ‘দিন বদলের’ লড়াই

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০১:২৯ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে জামায়াতে ইসলামীর জয়ের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালের সেই জয়ের ধারা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবার ফিরিয়ে আনতে দিনরাত কাজ করছেন দলটির কর্মী-সমর্থকেরা। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে জেলায় সুসংহত অবস্থানে থাকা বিএনপি তাদের জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে মরিয়া। ভোটে দলীয় বিদ্রোহ বা প্রকাশ্য বিভক্তি না থাকলেও জয়ের প্রশ্নে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না দলটি।

আওয়ামী লীগহীন এ নির্বাচনে তিনটি আসনেই বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। তবে আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের দিকে টানতে দুই দলের নেতারাই চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের মতে, এ ভোটই জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

আসনভেদে প্রচারের তীব্রতায় ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও প্রচার সরগরম, কোথাও তুলনামূলক ফাঁকা। ভোটারদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটাররা দেখছেন জামায়াতে ইসলামীর ড. কেরামত আলীকে। এ ছাড়া আব্দুল হালিম (সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট), নবাব শামসুল হোদা (ইসলামী ফ্রন্ট), আফজাল হোসেন (জাতীয় পার্টি) ও মনিরুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এখানে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই।

শাহবাজপুর ইউনিয়নের আবুল কালাম বলেন, ছয়জন প্রার্থী থাকলেও মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের প্রচারই বেশি চোখে পড়ছে। অন্যদের তৎপরতা কম।

মোবারকপুরের সেতাব উদ্দিন বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে লড়াই হবে। আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে দুই দলই চেষ্টা করছে।

কানসাটের হাফিজুর রহমান বলেন, শাহজাহান মিঞা একবার এমপি ছিলেন, কেরামত আলী দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। তাই ভোটের অঙ্ক মেলানো কঠিন।

শিবগঞ্জ পৌর এলাকার রনি আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন কিছুটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে ভোটার পাঁচ লাখ ১৮১ জন। এর মধ্যে নারী দুই লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৫ এবং পুরুষ দুই লাখ ৫৫ হাজার ৩১৬। তরুণ ভোটার সাত হাজার ৬০২ জন। ১৫৯টি ভোটকেন্দ্রের ৯৩৬টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।

নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে পাঁচজন দলীয় প্রার্থী রয়েছেন। বিএনপির আমিনুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাবের মধ্যেও তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতের মীম ওবায়দুল্লাহ জয়ী হয়েছিলেন।

ভোটারদের ধারণা, আমিনুল ইসলামের সঙ্গে জামায়াতের ড. মিজানুর রহমানের মূল লড়াই হবে। অন্য প্রার্থীরা হলেন খুরশিদ আলম বাচ্চু (জাতীয় পার্টি), সাদেকুল ইসলাম (সিপিবি) ও ইব্রাহিম খলিল (ইসলামী আন্দোলন)।

নাচোলের সেলিম রেজা বলেন, মাঠে বিএনপি ও জামায়াত বেশি সক্রিয়। মনে হচ্ছে দুই দলের নির্বাচন।

টুনু পাহান বলেন, আদিবাসীরা শান্তিতে থাকতে চায়। জমি দখল, হানাহানি চাই না।

রিপন আলী বলেন, আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল হলে জামায়াত লাভবান হতে পারে।

আব্দুস সামাদ বলেন, মূল লড়াই হবে আমিনুল ইসলাম ও মিজানুর রহমানের মধ্যে।

এ আসনে ভোটার চার লাখ ৬১ হাজার। নারী দুই লাখ ৩২ হাজার ১৭৪, পুরুষ দুই লাখ ২৮ হাজার ৮২৫ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন। তরুণ ভোটার ছয় হাজার ৬৫৫ জন। ১৮৪টি ভোটকেন্দ্রের ৮৭৭টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।

সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচন তুলনামূলক জমজমাট। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে জামায়াতের লতিফুর রহমান এখানে জয়ী হয়েছিলেন। এরপর দলটি আর জয় পায়নি, তবে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রেখেছে।

২০০৮ সালে লতিফুর রহমান ৭২ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। বিএনপির হারুনুর রশিদ ৭৬ হাজার ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। ২০০১ সালে হারুনুর রশিদ সাড়ে ৮৫ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হন। এবারও তিনি ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নুরুল ইসলাম।

স্থানীয়দের মতে, এখানে দুই দলের সংগঠনই শক্তিশালী। আওয়ামী লীগের ভোট যার দিকে বেশি যাবে, তার পাল্লাই ভারী হবে।

সুন্দরপুরের শহিদুল ইসলাম বলেন, পদ্মার ভাঙন রোধ ও চরাঞ্চলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।

জুবায়ের বলেন, প্রতীক দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেশি। আওয়ামী লীগের ভোট বিভক্ত হলে ফলাফলে প্রভাব পড়বে।

আবু তালেব বলেন, এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই, যিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ভালো করবেন।

নিখিল চন্দ্র কর্মকার বলেন, পরিবেশ ভালো থাকলে ভোট দিতে যাব।

রেজাউল করিম বলেন, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশ চালাতে সক্ষম দলকেই ভোট দেব।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া বলেন, ধানের শীষের প্রতি মানুষের সমর্থন রয়েছে।

জেলা জামায়াতের আমির আবুজার গিফারী বলেন, তিনটি আসনেই বিজয়ের সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রয়েছে তাঁদের ইশতেহারে।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে ভোটার চার লাখ ৬৮ হাজার ৪৭৯ জন। নারী দুই লাখ ৩১ হাজার ৮৩১ ও পুরুষ দুই লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৮। তরুণ ভোটার সাত হাজার ৯৭৪ জন। ১৭২টি ভোটকেন্দ্রের ৯২৮টি কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে।

এসএইচ