রাজশাহী: রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকায় অবস্থিত বস্তিটি মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। ভদ্রা বস্তি নামে রেললাইনের পাশে বস্তিটিতে প্রায় ২০০টি পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে সাত-আটটি পরিবার দীর্ঘ দিন ধরেই গাঁজা, ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট বিক্রি করে চলেছে।
মাদকের রমরমা ব্যবসা চলায় থানায় খবর দিলে পুলিশ বলে এটা রেলওয়ে থানার কাজ। আর রেলওয়ে থানা দায় এড়িয়ে যায় মেট্রোপলিটন পুলিশ দেখবে বলে। কোনো পুলিশেরই যখন সেখানে পা পড়ে না, তখন সেখানে মাদক বিক্রেতার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যায়। এ অবস্থায় বস্তির মাদক কারবার ঠেকাতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এলাকাবাসী। এই সামাজিক প্রতিরোধকে পুলিশও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
স্থানীয়রা জানান, বস্তির মাদক নির্মুল করতে এলাকার বাসিন্দারা একমত হয়েছেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বস্তিতে কাউকে মাদক বিক্রি করতে দেবেন না। বাইরে থেকে মাদকের ক্রেতাদেরও আসতে দেবেন না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বস্তিতে যারা মাদক বিক্রি করেন তাদের ধরে ধরে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তাদের কাছে মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। পরে সেগুলো প্রকাশ্যেই পুড়িয়ে ধংস করা হয়। সেদিন ইফতারের পরই এক বাড়িতে মাদক সেবনের আসর বসিয়েছিলেন কিছু তরুণ। এলাকাবাসী সেখানেও হানা দেন। তখন সবাই পালানোর চেষ্টা করলেও সবাইকে ধরে সতর্ক করা হয়। এরপর তাদের কাছে পাওয়া মাদকদ্রব্য ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম পুড়িয়ে ধংস করা হয়।
এই অভিযানের সময় মাদকসেবীদের আসরে পাওয়া যায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সরফরাজ নেওয়াজকেও। পরে তাকেও সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাদক বিক্রেতাদের তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশি করা হয় বাড়িতেও। তখন মাদকদ্রব্যসহ ধরা পড়েন ফুয়াদ ও ময়না বেগম নামের দুজন। পরে তাদেরও সতর্ক করা হয়। এলাকাবাসীর এমন কার্যক্রমে মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবীরা আতঙ্কিত। এরই মধ্যে এলাকাবাসীর এমন প্রতিরোধের বিষয়টি জানতে পেরে বুধবার বস্তিতে অভিযান চালিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের সদস্যরা
এ সময় কিছু গাঁজাসহ ধরা পড়েন ময়না বেগম, আব্দুল্লাহ ও ফুয়াদ নামের তিনজন বিক্রেতা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের প্রসিকিউটর হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে এই তিনজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই বস্তির মাদক নির্মুলে এলাকাবাসী যে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তা প্রশংসনীয়।’
জানা গেছে, ভদ্রা বস্তিতে মাদকবিরোধী এই কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তি মো. রুবেল, মো. জিয়া, নগর যুবদলের সদস্য বিপ্লব রহমান নাঈম, ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য চাঁন মিয়া নয়ন, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক হামিদুল ইসলাম, স্থানীয় বাসিন্দা আবু সাঈদ, শাওন আলী, মো. আক্কাশ, মো. আশিকসহ এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা।
বিপ্লব রহমান নাঈম বলেন, থানা পুলিশ ও রেলওয়ে পুলিশ একে-অপরকে দেখিয়ে অভিযানে আসে না। বস্তি হয়ে উঠেছিল মাদকের স্বর্গরাজ্য। তাই এলাকার সবাই মিলে তারা এই প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের প্রতিরোধের কারণে মাদক বিক্রেতারা ভয়ের মধ্যে আছেন। প্রতিরোধ চলবে।
রাজশাহী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়সাল বিন আহসান বলেন, ‘বস্তি আসলেই আমাদের মধ্যে পড়ে না। রেললাইনের দুইপাশে যতদূর পাথর থাকে, সেই ১০ ফুট জায়গা আমাদের থানার অধীনে। পাশের এলাকা আমাদের না। তাই আমরা যাই না।’
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেলে আমরা অভিযানে যাই না, এমন তথ্য সঠিক না। অভিযান করি। তারপরও এলাকাবাসী যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন সেটা ভালো। মাদকের বিরুদ্ধে আসলেই সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন।’ মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স।
পিএস