পোকা দমন কববে ‘গ্রেইন গার্ড’ ডিভাইস

  • ময়মনসিংহ প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১০:৫৪ এএম

পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণের কারণে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি মোকাবেলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে হয়। এর ফলে সংরক্ষিত ধানের গুণগতমান খারাপ হয়ে যায়, যা অঙ্কুরোদগমের হার এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে। এই ক্ষতি  কৃষকের আয় এবং খাদ্যের সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
 
বাংলাদেশের কৃষকরা সাধারণত নিজেদের ভোগ, জরুরি প্রয়োজন এবং পরবর্তী বপন মৌসুমের জন্য বীজের চাহিদা মেটাতে ধান সংরক্ষণ করেন। কৃষকরা সবচেয়ে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন যা বায়ুরোধী নয়, এবং এই ধরনের কাঠামোতে সংরক্ষিত ধান জৈবিক, পরিবেশগত, পোকামাকড় এবং অন্যান্য কারণের জন্য ক্ষতির শিকার হয়।

বাংলাদেশে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি মোকাবেলা করা, বিশেষ করে সংরক্ষণকালীন ক্ষতি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশে ক্ষতির প্রধান কারণ হলো পোকামাকড়ের আক্রমণ। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পোকামাকড়, ছত্রাক এবং ফাঙ্গাসের দ্রুত বংশবৃদ্ধি এবং বীজের অবনতির জন্য অনুকূল।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, পোকা/কীটপতঙ্গের আক্রমণের কারণে বাংলাদেশে ধানের সংরক্ষণকালীন ক্ষতি ৭-১২ শতাংশ। তবে, ধান (শস্য) কাটার-পরবর্তী ক্ষতি শুধু খাদ্যের ক্ষতি হিসেবেই নয়, বরং এটি উৎপাদনে ব্যবহৃত সমস্ত সম্পদেরও ক্ষতি, যেমন—শ্রম, জমি, পানি, সার, কীটনাশক, শক্তি ইত্যাদি।

সংরক্ষিত ফসলের পোকা দমন করতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা উদ্ভাবন করলো নতুন ডিভাইস ‘গ্রেইন গার্ড’। এ আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিভাইস উদ্ভাবন করেছেন বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়ালের নেতৃত্বে একদল গবেষক।

দেশে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি  হ্রাসের উপর এই প্রকল্পটি ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবিকার পাশাপাশি এই অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতা, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং নীতি ও নিয়ন্ত্রক উন্নয়নের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রকল্পটি ফসল-কাটার ক্ষতি কমাতে, সংরক্ষণ সুবিধার উন্নতি করতে, সচেতনতা ও জ্ঞানগত সক্ষমতা বাড়াতে, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মান উন্নত করতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সহনশীলতা বাড়াতে এবং বাজারের সুযোগ বৃদ্ধি করতেও অবদান রাখে। এর প্রাথমিক প্রভাব হলো ফসল কাটার পর ক্ষতি কমানো।

কীটপতঙ্গ বিতাড়িত করার মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করে যে আরও বেশি ধান ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। যেহেতু এই ব্যবস্থাটি রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করে না, তাই এটি স্বাস্থ্যখাতের খরচ বাঁচায় এবং গুণমান ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যও রক্ষা করে। এই ব্যবস্থার ব্যয়-সাশ্রয়ীতার কারণে এটি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজলভ্য।

২০২৩ সালে মোট ধান উৎপাদন ছিল ৫৮.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন (এফএও, ২০২৩)। এর মাত্র ৫% সাশ্রয় করা গেলে বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে ধানের বীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫.৮৩ লক্ষ মেট্রিক টন। এর ফলে ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম হার কমপক্ষে ১০% বৃদ্ধি পাবে (অর্থাৎ ১০% বীজ সাশ্রয় হবে), যার অর্থ ৩,৫০,০০০ মেট্রিক টন ধানের বীজ সাশ্রয় হবে। অধিকন্তু, শস্যের পুষ্টিগুণ সংরক্ষিত হবে যা অমূল্য।

গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়াল জানান, বাংলাদেশে ধান কাটার পর সংরক্ষনে পোকার আক্রমণে নষ্ট হয় ১৭%। গুদামে এর পরিমান আরো বেশি।  দেশের তাপমাত্রা ও আদ্রতা কারনে এ সমস্যা গুলো দেখা দেয়। আমাদের দেশে খাদ্যগুদাম বা অন্য কোথাও ধান বা গম অন্যান্য বীজ প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ১০ % শুধু সংরক্ষণে পোকা দ্বারা ক্ষতি হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবেলা করার জন্য আমরা একটি ডিভাইস তৈরী করেছি। যাতে করে খাদ্য গুদামে সকল ধরনের বীজ যেমন ধান, গম, ভুট্টায় যে পোকা গুলো হয় তা দমন করতে পারে এই ডিভাইস

তিনি আরো জানান, এই ডিভাইসটির নাম দেওয়া হয়েছে গ্রেইন গার্ড। এটি ব্যবহার করা খুবই সহজ ও পরিবেশ বান্ধব। এটিতে আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ডিভাইসটি উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির এমন শব্দ তরঙ্গ উৎপন্ন করে যা মানুষের কানে শোনা যায় না। তবে তা পোকামাকড়ের স্নায়ুতন্ত্র ও আচরণে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এর ফলে পোকাগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। খাদ্য গ্রহণে ব্যাঘাত ঘটে এবং প্রজনন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে তারা ধীরে ধীরে সংরক্ষিত শস্য থেকে দূরে সরে যায়। এই পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয় না। তাই এই ডিভাইস খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি সমাধান হিসেবে কার্যকর ভুমিকা পালন করবে।

কৃষক যেমন এই ডিভাইসটি তার বীজ সংরক্ষণের জায়গায় রাখতে পারে, তেমনি খাদ্য গুদাম গুলোতেও সহজেই এটি ব্যবহার করা যাবে। এই ডিভাইসটিতে আছে রিচার্জেবল ব্যাটারি। তাই এটি বিদ্যুৎ সহ আবার বিদ্যুৎ ছাড়াপ চলবে। পোকামাকড় শস্য ক্ষতি করতে না পারায় আমরা সহজে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে পারব। এই ডিভাইসটির দাম খুবই কম। যার কারনে কৃষকরা সহজে এটি ব্যবহার করতে পারবে, পাশাপাশি সরকারি গুদাম গুলোতেও এটি ব্যবহার করা যাবে। কৃষক, গুদাম কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই গ্রেইন গার্ড ডিভাইস নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। 

অধ্যাপক ড. আব্দুল আওয়াল আরো জানান, এই প্রযুক্তির উন্নয়ন, নকশা প্রস্তুত, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ এবং মাঠ পর্যায়ে গবেষণা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় ২ থেকে ৩ বছর সময় লেগেছে। যেখানে ডিভাইসটির কার্যকারিতা চুড়ান্ত করার জন্য বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা ও সংশোধন করা হয়েছে। গ্রেইন গার্ড’ প্রযুক্তিটি কৃষিক্ষেত্রে পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যা ভবিষ্যতে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব করে তুলতে সক্ষম।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্স ওন্ড ইনোভেশন সেন্টার পরিচালিত ‘ডেভলপমেন্ট অফ স্মার্ট আলর্ট্রাসনিক পেস্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ফর পোস্ট হারভেস্ট লস রিডাকশন ইন স্টোর প্যাডি’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন করেছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। এরই মধ্যেই এই ডিভাইসটি নিতে বিএডিসিসিহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের অনুমোদন পেলে এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সম্ভব বলেও জানান তিনি।

এম