পিরোজপুর: পিরোজপুরের নেছারাবাদে জন্ম নিয়েছে হাত-পা বিহীন এক নবজাতক। শিশুটির দুই পা নেই এবং একটি হাত অর্ধেক। জন্মের পর শিশুটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তার বাবা। এমনকি সন্তানকে অন্যত্র দিয়ে দিতে কিংবা ফেলে আসারও নির্দেশ দেন তিনি। তবে স্বামীর সেই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সন্তানকে বুকে নিয়েই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মা লিজা আক্তার।
বিষয়টি আজ রোববার (২৬ এপ্রিল) সকালে নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, গত বুধবার (২২ এপ্রিল) রাত ৮টার দিকে উপজেলার মিয়ারহাট বন্দরের নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে ছেলে সন্তানটির জন্ম হয়। শিশুটির পিতা দিনমজুর আল আমীন নবজাতককে নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তারা মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
প্রসূতি লিজা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাসও তাঁর সার্জন ফি গ্রহণ করেননি।
লিজা আক্তারের বাড়ি পার্শ্ববর্তী নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামে। হাসপাতালের বেডে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, এটি তাঁর তৃতীয় সন্তান। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করেন। সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় কয়েক দিন আগে বাড়িতে আসেন এবং ২২ এপ্রিল সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে এই সন্তানের জন্ম দেন।
তিনি বলেন, “আমার সন্তান অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে জন্মায়নি। তার দুই পা ও একটি হাত নেই। এ কারণে আমার স্বামী তাকে ফেলে আসতে বলেছে। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে কখনো ফেলে দিতে পারব না। স্বামী আমাকে না রাখলেও আমি আমার সন্তানকে ছাড়ব না। আমি তাকে মানুষ করে তুলব।”
লিজা আরও বলেন, “আমি যত দিন বেঁচে আছি, কাজ করে সন্তানকে খাওয়াতে পারব। কিন্তু আমি মারা গেলে আমার সন্তানকে কে দেখবে—এই চিন্তাই আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি যদি সাহায্যের হাত বাড়ান, তাহলে আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও নিশ্চিত হতে পারে।”
নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, “দিনমজুর এই নারী ও নবজাতকের অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের সার্জন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রীতিশ বিশ্বাস, সহযোগী ডাক্তার মোস্তফা কাউসার, অজ্ঞানের ডাক্তার নাসরিন রহমান খান। এর তিন বিশিষ্ট অপারেশন টিমটি তাদের অপারেশন চার্জ মানবিক কারণে ফ্রি করে দিয়েছেন এবং হাসপাতালের সব খরচ মওকুফ করেছি।
অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাস বলেন, “জিনগত কারণ বা গর্ভকালীন যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অনেক সময় এ ধরনের শিশু জন্ম নিতে পারে। অপারেশনটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তবে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শিশুটির শারীরিক ত্রুটি আমাদেরও মর্মাহত করেছে। মানবিক দিক বিবেচনায় আমি আমার সার্জন ফিও মওকুফ করেছি।”
একদিকে বাবার নির্মম অস্বীকৃতি, অন্যদিকে মায়ের অটুট ভালোবাসা—এই নবজাতকের জন্ম যেন সমাজের সামনে এক মানবিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। এখন সহানুভূতিশীল মানুষের সহযোগিতাই হতে পারে শিশুটির ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভরসা।
পিএস