লালমনিরহাট: প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় দুই বছর ধরে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম।
তিনি লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক এবং জুলাই আন্দোলনের পর থেকে একাধিক হত্যা মামলার আসামি হয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনটি ‘তৃতীয় বিভাগ’ থাকা সত্ত্বেও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান শরওয়ার আলম। পরবর্তীতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে ২০১২ সালে তিনি অধ্যক্ষ পদটি বাগিয়ে নেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রভাষক থেকে অধ্যক্ষ হতে ১২ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন থাকলেও, মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দলীয় ক্ষমতায় এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি দখল করেন।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের অভিযোগ, দলীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ টাকার সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ করেছেন। বিগত সরকারের সময় তার এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। গত বছরের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর অভিযোগ দেন শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দ।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তৎকালীন ইউএনও নূর-ই আলম সিদ্দিকী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী তিন মাস পর বরখাস্তের মেয়াদ শেষ হলে তিনি পুনরায় পূর্ণ বেতন পেতে শুরু করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হলে শরওয়ার আলম প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ করে দেন। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘উৎকোচ’ দিয়ে তিনি পলাতক থাকা অবস্থায় এখনো নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন।
এদিকে অধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন, যার বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। চার বছরের সাজাপ্রাপ্ত ও বর্তমানে গ্রেপ্তার হওয়া সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামানকে নিয়মিত বেতন প্রদান করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের ইট ও খোয়া নিজের বাড়িতে পাচার এবং ফ্যান চুরির মামলা ও আপসের নামে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার নামে।
সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে সেখানে কোনো চেইন অব কমান্ড নেই এবং শিক্ষকরা সময়সূচি মানছেন না। উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানায়, অধ্যক্ষ না এসেও বেতন পাচ্ছেন দেখে অন্য শিক্ষকরাও নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন না, প্রতিদিন মাত্র দুই থেকে তিনটি ক্লাস হয়।
এদিকে একাধিক অভিভাবকরা জানান, শিক্ষকদের পাঠদানের দিকে কোনো নজর নেই, ফলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটির সুনাম দিন দিন ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
এ বিষয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) তমিজার রহমান জানান, অধ্যক্ষ আন্দোলনের শুরু থেকেই অনুপস্থিত এবং তিনি কোথায় আছেন তা তাদের জানা নেই।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইউএনওর নির্দেশে তিনি বেতনের কাগজে সই করেন এবং সরকার বেতন দেওয়ায় তিনি তা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার জানান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতনের শিট প্রস্তুত করে দিলে তিনি শুধু তা অনুমোদন করেন। তিনি আরও জানান, পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেছেন, যা তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পিএস