দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ভাঙ্গুড়া পাটক্রয় কেন্দ্র, সরকারি সম্পত্তি প্রভাবশালীদের দখলে

  • পাবনা প্রতিনিধি  | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম
ছবি : প্রতিনিধি

পাবনা: পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার বড়ালব্রিজ রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন চৌবাড়িয়া গ্রাম। গ্রামের কোল ঘেঁষে বড়ালব্রিজ রেলওয়ে খেলার মাঠ। আর মাঠের দক্ষিণ পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের একটি পাটক্রয় কেন্দ্র। কিন্তু প্রাণ নেই এখানে। কারণ দীর্ঘ বছর ধরে বন্ধ পাটক্রয় কেন্দ্র। এই সুযোগে দখলদারদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত সেখানকার জমি।

একসময় চলনবিল অঞ্চলের পাট চাষিদের আনাগোনায় মুখর থাকতো এই এলাকা। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের প্রভাবে থমকে যায় এই পাটক্রয় কেন্দ্রের কার্যক্রম। তদারকির অভাবে প্রায় সাড়ে তিন একর মূল্যবান সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

ভাঙ্গুড়া পাটক্রয় কেন্দ্র ঠিক কবে নাগাদ বন্ধ হয় সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ৯০ দশকের শেষ নাগাদ পাটক্রয় কেন্দ্রটি বন্ধ হয় বলে জানা গেছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই পাটক্রয় কেন্দ্রের বেশিরভাগ জমি এখন প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে। গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের চোখের সামনে প্রকাশ্যে দখলবাজি চললেও ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত এক দশকে পাটক্রয় কেন্দ্রের জমিতে অবাধে গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবন, স্কুল, মাদ্রাসা এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। অবৈধ স্থাপনা ভাড়া দেয়ার পাশাপাশি বিক্রিও করেছেন অনেকে।

২০২৩ সাল থেকে জুট কর্পোরেশন কাছ থেকে পাটক্রয় কেন্দ্রের ২ দশমিক ১৯ একর জমি বৈধ প্রক্রিয়ায় ভাড়া নিয়েছেন বিএম গোলজার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে, শর্ত ভঙ্গ করে বিজেসির মূল্যবান যন্ত্রপাতি বিক্রি ও স্থাপনা সাব ভাড়াটিয়া বসানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আলাপকালে চৌবাড়িয়া হারোপাড়া গ্রামের সত্তোর্ধ নুরুল ইসলাম বলেন, এই জায়গাটা এক সময় খুব জমজমাট ও উন্নত ছিল। ব্যবসায়ী কেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ভালই চলছিল পাটক্রয় কেন্দ্রটি। কিন্তু এক দশক আগে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। এখন দেখি গোলজার হোসেন নামের একজন লীজ নিয়েছেন বলে দাবি করে দখল করে বসে আছে। এর মধ্যে কিছু জমি বিক্রিও হয়েছে।

চৌবাড়িয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের শাহীন আলম বলেন, আমার দাদা এই পাটক্রয় কেন্দ্রের সরদার ছিলেন। ওই সময় দেখেছি এখানে অনেক পাট কেনাবেচা হতো। কৃষক, ব্যাপারীরা নদীপথে পাট নিয়ে এসে এখানে বিক্রি করতেন। অনেক মানুষের আনাগোনা ছিল। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেছে।

একই গ্রামের জহুরুল ইসলাম বলেন, এই পাটক্রয় কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর অনেকেই বেকার হয়ে গেছে। যদি দখলমুক্ত করে আবার চালু করা যায় তাহলে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতো। এলাকার পাটচাষীরা লাভবান হতেন।

চৌবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল রানা বলেন, পাটক্রয় কেন্দ্রটি অনেক বছর যাবত অরক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। বেদখল হয়ে গেছে। জমি কেনাবেচা হচ্ছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই। এটা যদি উদ্ধার করে চালু হয় তাহলে এলাকার মানুষের জন্য অনেক উপকারে আসবে।

দখল হওয়া জমিতে ঘর ভাড়া থাকেন ষাটোর্ধ বিধবা আছিয়া খাতুন। তিনি বলেন, এখানে দুখু মিস্ত্রির কাছ থেকে জমি কিনেছেন জহুরুল ইসলাম নামের একজন। সে এখানে ঘর করে ভাড়া দিয়েছে। আমাদের থাকার মতো বাড়িঘর নেই। তাই এখানে জহুরুলের কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিয়ে চার বছর ধরে বসবাস করছি। প্রতিমাসে ১২০০ টাকা ভাড়া দেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েক বাসিন্দা জানান, গোলজার হোসেন লীজ নিলেও, পাট ক্রয় কেন্দ্রের জায়গা বিক্রি হয়ে কয়েক হাত বদল হয়েছে। কেউ ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে খাচ্ছে। বিক্রি না হলে পাকা ঘরবাড়ি স্কুল কিভাবে হয়। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় এটা অবৈধ দখলে চলে যায়।

পাটক্রয় কেন্দ্রের জায়গায় রয়েছে ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, মিফতাহুল ফালা পিন ক্যাডেট মাদ্রাসা, একটি মসজিদ, একটি মন্দির। এছাড়া শওকত আলী ও আফরোজা বেগম নামে দুই ব্যক্তির জায়গা রয়েছে। যেগুলো তারা ভুয়া কাগজপত্র তৈরী করে দখল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দখলের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল এন্ড কলেজের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আব্দুল হাই সিদ্দিকী বাচ্চু বলেন, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পাটক্রয় কেন্দ্রের জায়গার বাইরে। সরকারি সম্পত্তিতে অবস্থিত। আমরা স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে ৮ শতাংশ জায়গা লিজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে পাটক্রয় কেন্দ্রের জায়গা দখলের অভিযোগ সত্য নয়।

মিফতাহুল ফালাহ প্রি ক্যাডেট মাদরাসার পরিচালক হাফেজ ক্বারী গোলাম মোস্তফা রবি বলেন, অনেকেই জায়গা দখল করেছে। সেটা দেখে আমিও একটি মাদ্রাসা করেছি। আমি কোনো লীজ নেই নাই। সরকার চাইলে ছেড়ে দিতে হবে।

আফরোজা বেগম নামের গৃহবধূ বলেন, আমি ভূমি অফিস থেকে লীজ নিয়েছি ৫ শতাংশ জমি। সেখানে বাড়ি নেই, কিছু আম গাছ লাগানো আছে। ওই জমি পাটকেন্দ্রের জায়গা নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযুক্ত লীজ গ্রহিতা বিএম গোলজার হোসেন বলেন, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে বৈধভাবে আমাকে লীজ দেয়া হয়েছে। এরকম সারাদেশে ১১৪টি কুঠি লীজ হয়েছে। তার মধ্যে আমি একজন। লীজ পাওয়ার পর আমি এখানে খামার করেছি। বিক্রি করার অভিযোগ সঠিক নয়। তার এখতিয়ারও আমার নেই। তবে দোকানপাট ও ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেয়ার এখতিয়ার আমার আছে। বাৎসরিক দেড় লাখ টাকা লীজমানি দিয়ে আমি এখানে আছি।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, ওই জমিটি বর্তমানে পাট মন্ত্রণালয়ে অধীনে আছে। রেকর্ডীয় মালিক জেলা প্রশাসন। তবে এ বিষয়ে পাট মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি মামলা চলমান রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২০২৭ সাল পর্যন্ত গোলজার হোসেন নামের একজনকে পাট মন্ত্রণালয় থেকে ইজারা দেয়া আছে।

তিনি বলেন, পাটক্রয় কেন্দ্রের মোট জায়গা ৩ দশমিক ৫৫ একর। গোলজার লীজ নিয়েছেন ২ দশমিক ১৯ একর। এর বাইরে আরো জায়গা আছে পাটক্রয় কেন্দ্রের। সে জায়গা তো আমরা লীজ দিতে পারিনা। আর আমার জানা মতে এ বছর বা গতবছর ভূমি অফিস থেকে সেখানে কোনো জায়গা লীজ দেয়া হয়নি। আর জমি লিজ নিলে তো প্রতিবছরই রিনিউ করতে হয়। কেউ যদি উপজেলা এসিল্যান্ড অফিস থেকে লীজ নেয়া দাবি করে তাহলে সেটা সঠিক নয় বলে মনে করি।

মিজানুর রহমান আরো বলেন, আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে কিছু অনিয়ম ভুল ত্রুটি পেয়েছি। অবৈধ দখলদার, পাকা ভবন পেয়েছি। বিষয়টি ইতিমধ্যে পাট মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব স্যারকে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। তবে নতুন করে যাতে কেউ অবৈধভাবে দখল করতে না পারে সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাট অধিদপ্তর থেকে একটি চিঠি এসেছে। আমরা খুব দ্রুতই সেখানে সরেজমিন তদন্ত করে যারা অবৈধ দখলদার আছে তাদের উচ্ছেদে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মাকছিম এর সাথে। জায়গা অবৈধ দখল হয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা আন্তরিক। পাবনা জেলা প্রশাসনকে জানিয়ে আমাদের চেয়ারম্যান মহোদয় একটি পত্র দিয়েছেন। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

পিএস