বরিশালে ঐতিহ্যের সাক্ষী দেড় শতকের ‘চান বাংলো’

  • বরিশাল প্রতিনিধি   | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম
ছবি : প্রতিনিধি

বরিশাল: আধুনিকতার ছোঁয়ায় দ্রুত বদলে যাচ্ছে বরিশাল নগরীর চিত্র। একের পর এক পুরোনো স্থাপনা হারিয়ে গেলেও নগরীর রাজা বাহাদুর সড়কের এক শান্ত পরিবেশে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী চান বাংলো। ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির অনন্য এই নিদর্শন আজও বহন করে চলেছে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি।

সবুজ গাছপালায় ঘেরা মনোরম পরিবেশে অবস্থিত কাঠের তৈরি দোতলা ভবনটির সামনে রয়েছে শ্বেতপদ্মে আচ্ছাদিত একটি পুকুর। পুকুরের জলে ভবনের প্রতিফলন যেন অতীতের এক নান্দনিক চিত্রকর্মের আবহ তৈরি করে। কাঠের দেয়াল, প্রশস্ত বারান্দা ও শৈল্পিক নির্মাণশৈলী ভবনটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করলেই অনুভূত হয় পুরোনো দিনের আবহ। চারপাশের নিস্তব্ধতা, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং শতবর্ষী কাঠামো দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাসের গহীনে। নগর জীবনের কোলাহল থেকে দূরে এই স্থানটি এখনও অতীতের স্মৃতি আগলে রেখেছে আপন মহিমায়।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথভিত্তিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বরিশাল। সে সময় ‘চান বাংলো’ ছিল স্টিমার কোম্পানির বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম কেন্দ্র। পরবর্তীতে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এটি ব্রিটিশ স্টিমার কোম্পানি আরএসএম-এর কার্যালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তবে ভবনটির সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিল এই ভবনে ক্যাম্প স্থাপন করেন। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কৌশলগত পরিকল্পনা, বৈঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি। স্বাধীনতার পরও ভবনটির গুরুত্ব অটুট ছিল। ১৯৭৯ সালে বরিশালে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর কার্যক্রম বরিশালে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে এই ভবন।

ইতিহাসবিদ ও লেখক বুলবুল আহমেদ বলেন, চান বাংলো শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, এটি বরিশালের নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে। এমন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। বর্তমানে ভবনটি বিআইডব্লিউটিএর গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন অতীতের স্মৃতি জানতে এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

সময়ের প্রবাহে বরিশালের অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা হারিয়ে গেলেও ‘চান বাংলো’ এখনও অতীতের গৌরব ধারণ করে টিকে আছে। ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং প্রশাসনিক বিকাশের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী এই ভবনটি বরিশালের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই স্থাপনাটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।

পিএস