ইলিশের আশায় সাগরে, হতাশা নিয়ে ঘাটে ফিরছেন জেলেরা

  • পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিনিধি | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
ছবি : প্রতিনিধি

পাথরঘাটা: সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে টানা ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে বিপুল আশা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে যাত্রা করেছিলেন বরগুনার পাথরঘাটার হাজারো জেলে। তবে সাগরে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা না পেয়ে চরম হতাশা ও আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে এখন মাছের তীব্র সংকট  চলছে, যা পুরো অঞ্চলের মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিকে স্থবির করে তুলেছে।

পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্যঘাট ও জেলে পল্লী ঘুরে জানা গেছে, গত ১১ জুন মধ্যরাতে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই উপকূলীয় প্রায় ৩০ হাজার জেলে ট্রলারসহ রসদ সামগ্রী নিয়ে গভীর সমুদ্রে পাড়ি জমান। কিন্তু প্রথম দফায় সাগরে জাল ফেলেও আশানুরূপ ইলিশ কিংবা অন্য কোনো সামুদ্রিক মাছের দেখা পাচ্ছে না। প্রতিটি ট্রলারে লাখ টাকার বেশি খরচ করে সাগরে গিয়ে শূন্য হাতে কিংবা নাম মাত্র মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে হচ্ছে। যেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নিয়ে ঘাটে আশার কথা জেলেদের সেখানে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে ঘাটে। পাথরঘাটার মৎস্য আড়তগুলোতে এ সময়ে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখরিত থাকার কথা থাকলেও সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। ঘাটে অধিকাংশ আড়ৎদার ও শ্রমিকরা অলস সময় পাড় করছেন। মাঝে মধ্যে দু-একটি ট্রলার ঘাটে ভিড়লেও তাতে আশানুরুপ কোনো মাছ থাকছে না। মাছের সরবরাহ কম থাকায় পাইকারি ক্রেতা ও আড়তদারদের মাঝেও চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।

বিএফডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৫৮ দিনে মৎস্য শিকার নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগের এক সপ্তাহে ইলিশ মাছ ছিল ৩২.৩৬ মেট্রিক টন এবং মিশ্রিত মাছ ৪৩.৩৪ মেট্রিক টন। এ থেকে রাাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৬০ টাকা এবং নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরের এক সপ্তাহের হিসেবে পাওয়া গেছে, ইলিশ মাছ ১২.১০ মেট্রিক টন, মিশ্রিত মাছ ২১.২৬ মেট্রিক টন। এ মাস থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ টাকা। নিষেধাজ্ঞার আগে যে পরিমাণ মাছ পেয়েছেন জেলেরা এখন ভরা মৌসুমেও সে পরিমাণ মাছ নেই। এ নিয়ে হতাশায় পড়েছেন আড়ৎদার, পাইকার এবং জেলে শ্রমিকরা। 

সমুদ্র থেকে ঘাটে ফিরে আসা জেলে করিম , আলম বয়াতি এবং ফরিদ মিয়া বলেন, দুই মাস সাগরে যাওয়া বন্ধ থাকায় চরম কষ্টে দিন কেটেছে। ধারদেনা করে ট্রলারে তেল ও খাবার তুলে সাগরে গিয়েছিলাম ঋণ শোধ করার আশায়, কিন্তু সাগরে মাছ নেই। এখন তেলের খরচও উঠছে না, লোকসানের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে। অবৈধভাবে ট্রলিং ও ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ ধরে ফেলায় সাগরে মাছের আকাল তৈরি হচ্ছে এবং প্রকৃত জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তারা আরো বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় আমরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকি, কিন্তু কিছু অসাধু জেলে ও ট্রলার মালিক আছে তারা নিষেধাজ্ঞার আইন অমান্য করে সাগরে গিয়ে মাছ শিকার করে। ওই সকল জেলেদের ছোট ফাসের জাল হওয়ায় সকল ধরনের মাছ ও মাছের পোনা মারা পড়ছে। তাদের দিকে সরকারের নজর দেয়া উচিৎ। তা না হলে আমাদের এই মৎস্য পেশা বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে মনে করছি।

পাইকার রুবেল মিয়া বলেন, ২০০০ সালে আমি এই বিএফডিসি ঘাটে মাছের লেবার ছিলাম, সেখান থেকে আমি আজ পাইকারী ব্যবসা করে আসছি। সেই সময় যে মাছ ছিলো তার ৪ ভাগের ১ ভাগ মাছও এখন এই মাছ বাজারে উঠছে না। সমুদ্রে কাঠের তৈরী অবৈধ ট্রলিং ট্রলারগুলোতে ছোট ফসের জাল ব্যবহার করে মাছের ডিমসহ পোনা মাছ ধ্বংস করছে। এই অবৈধ ট্রলিং ট্রলার বন্ধ করতে না পারলে মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলেও দাবি করেছেন এই ব্যবসায়ী।

পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের ম্যানেজারর লেঃ কমান্ডার জিএম মাসুদ শিকদার বলেন, দেশের বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেদ্রের মধ্যে অন্যতম বন্দ্রর এটি। গত অর্থবছরে যে পরিমাণ মাছ এ অবতরণ কেদ্রে এসছে তার তুলনায় এ বছর মাছ অনেক কম। ধারনা করছি একের পর এক নিম্নচাপের কারণে এটি হতে পারে। আমি আশাবাদী সাগরের নিম্নচাপ কমে গেলে জেলেরা আশানারুপ মাছ পাবে।

পিএস