‘থানায় ঢুকে এভাবে কেউ নির্যাতন করে, আমরা কার কাছে যাব। পাবলিক দেখেছে, সাংবাদিক দেখেছে—একটা যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, একটা যদি ভুল তথ্য পায়, এই পোশাক খুলে ফেলব। এই পোশাক রাখব না। এই দেখেন কিভাবে একটা থানায় ঢুকে এভাবে কেউ নির্যাতন করে।’
বৃহস্পতিবার বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় মাদক মামলার এক আসামির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে থানায় হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ওই থানার ওসি মো. মাসুদ খান।
ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিম হামলার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় লোকজনসহ অন্তত ১২ জন আহত হন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, যে আসামিকে ঘিরে গুজব ছড়ানো হয়েছিল তিনি জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বাকাল ইউনিয়নের ফুল্লশ্রী গ্রামের রিয়াজ ফকির (২৬/২৭) নামে এক যুবককে বুধবার (৮ জুলাই) চুরি/মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করে আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে আগের একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে তাকে থানা হাজতে রাখা হয়।
পুলিশের দাবি, রাতে হাজতে থাকা অবস্থায় রিয়াজ নিজেই লোহার গরাদের সঙ্গে মাথায় আঘাত করতে থাকেন। থানা হেফাজতের সিসিটিভি ফুটেজেও এমন দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানানো হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে রাতেই তাকে প্রথমে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরের পর এলাকায় রিয়াজের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে তার স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিকেলে শতাধিক নারী-পুরুষ মিছিল নিয়ে আগৈলঝাড়া থানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা থানায় ঢুকে বিক্ষোভ ও হামলা চালান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে থানার ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিম, কনস্টেবল লিমন মিয়া, ফরহাদ হোসেন, মনির হোসেন, আল-আমিন হোসেন ও মেহেদী হাসান আহত হন। গুরুতর আহত এএসআই আব্দুল হালিমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহত পুলিশ সদস্যদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
হামলার পর আহত এএসআই আব্দুল হালিম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ডিউটি অফিসারের রুমে দায়িত্ব পালন করছিলাম। হঠাৎ মাদক মামলার এক আসামি থানায় মারা গেছে—এমন অভিযোগ তুলে আমার ওপর হামলা করা হয়। এ কথা বলতে বলতেই তিনি অঝোরে কেঁদে ফেলেন।
অন্যদিকে সংঘর্ষে রিয়াজ ফকিরের মা নাছরিন বেগম, বোন শারমিন আক্তার, মমতাজ বেগমসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যরা বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
রিয়াজের মা নাছরিন বেগম ও বাবা সিদ্দিক ফকির অভিযোগ করেন, তাদের ছেলেকে বিনা কারণে আটক করে পুলিশ মারধর করেছে। তাদের দাবি, ওই নির্যাতনের কারণেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ মাসুদ খান। তিনি বলেন, রিয়াজকে গ্রেপ্তারের পর হাজতে রাখা হয়েছিল। সেখানে তিনি নিজেই মাথায় আঘাত করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে একদল লোক থানায় হামলা চালিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে আহত করেছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক সাকিবুল হাসান জানান, রিয়াজ ফকির মেডিসিন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার গুরুতর কোনো আঘাত নেই। তবে মাথায় আঘাত রয়েছে।
ওসি মোহাম্মাদ মাসুদ খান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। থানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।
এম