ঝালকাঠি: ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার ৯৮ নং উত্তর জাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকদের নিয়মিত অনুপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া, সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের (স্লিপ ফান্ড) টাকা আত্মসাৎ এবং শিক্ষার্থীদের মিড-ডে মিলের খাবার (রুটি, ডিম, কলা, দুধ) চুরির ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা থেকে দূরে হওয়ায় বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকরা তাদের ইচ্ছামত যাতায়াত করেন। প্রায়শই প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য সহকারী শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন, যার ফলে পাঠদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। শিক্ষকদের এই গাফিলতির কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন, যার ফলে দিন দিন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহ জালাল তালুকদারের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য প্রতি বছর সরকার থেকে যে স্লিপের (SLIP) বাজেট দেওয়া হয়, তা কোনো কাজ না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এখানেই শেষ নয়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে যে ‘মিড-ডে মিল’ (দুপুরের খাবার)-এর ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও থাবা বসিয়েছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে সরকার মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগ নিলেও কাঁঠালিয়া উপজেলার ৯৮ নং উত্তর জাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। মোট ৪১ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিদ্যালয়ে মাত্র ৮ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও বাকীদের জন্য বরাদ্দের মিড-ডে মিলের খাদ্যসামগ্রী কোথায় যায়, তার কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহ জালাল তালুকদার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না এবং অধিকাংশ সময় নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেন। এতে করে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও খাদ্য বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে।
গতকাল রোববার (১৯ জুলাই) সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে সব মিলিয়ে মাত্র ৮ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। তবে খাতা-কলমে ও প্রতিদিনের খাদ্য বরাদ্দের হিসেবে উপস্থিতির সংখ্যা ৩৭ জন দেখানো হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অভিভাবকরা জানান। অতিরিক্ত খাদ্য বা বরাদ্দের টাকা কোথায় যাচ্ছে—এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রী সহকারী শিক্ষকের যোগসাজশে মিড-ডে মিলের সামগ্রী গোপনে পাচার ও চুরি করা হচ্ছে। ফলে সরকারি এই মানবিক উদ্যোগের কোনো সুফল পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষকরা স্কুলে আসেন না, আসলেও গল্প করে সময় কাটান। বাচ্চাদের ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না, তা চুরি করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। স্লিপের টাকা দিয়ে স্কুলের কোনো কাজ করা হয়নি। আমরা এই জঘন্য দুর্নীতির বিচার চাই।’
এই বিষয়ে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কে এম জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘বিদ্যালয়টির বিষয়ে আমরা কিছু মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। সরকারি টাকা আত্মসাৎ এবং মিড-ডে মিলের খাবার চুরির বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পিএস