লালমনিরহাট: ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের করা তালিকা অনুযায়ী লালমনিরহাটে নদীর সংখ্যা ১৬। তবে এই ১৬টি নদীর মধ্যে তিস্তা ও ধরলা নদীর অস্তিত্ব চোখে পড়লেও বাকী ১৪টি এখন অস্তিত্ব সংকটে।
সংকটাপন্ন নদীগুলো হলো, গিদারি, চেনাকাটা, টেংরামারী, মরাসতী, রত্নাই, ভাটেশ্বরী, স্বর্ণামতী, সতী, সানিয়াজান, সিংগীমারী, কোটেশ্বর,খাটুমারা, সাঙ্গুলী ও খেংটি। এছাড়াও ভারতের সঙ্গে আন্তসীমান্ত নদীগুলো হলো, তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান, গিদারী, টেংরামারী, সাঙ্গুলী, খেংটি ও মালদহ আন্তসীমান্ত নদী।
সরেজমিন ওই জানাগেছে, বছরের পর বছর ময়লা আবর্জনা ও কচুরিপানা জমে বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। এছাড়া এসব নদী থেকে অবৈধভাবে বোমা মেশিনে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবর্তন হয়েছে নদীর গতিপথ। আবার অনেক নদী দখল হয়ে ছোট খালে পরিনত হয়েছে। নদী অবৈধদখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা ও ঘরবাড়ি। আবার পলি জমে ভরাট হওয়া, উজান থেকে পানি না আসা এবং স্থানীয়ভাবে অবৈধ দখলের কারণেই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নদীগুলো।
[276121]
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সমীক্ষাতেও লালমনিরহাটের নদীগুলোর করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
উজানের দেশ ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে তিস্তা নদী সংকটাপন্ন। বছরের পর বছর পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সামান্য পানিতে বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় কৃষকের ফসল। আবার বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ হয় দুই পাড়ের মানুষ।
নদী ভাঙন এবং বন্যা থেকে রক্ষা পেতে যে মহাপরিকল্পনা গণদাবিতে পরিণত হয়েছে, তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তবে তিস্তা সুরক্ষায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশায় বুক বেঁধেছেন তিস্তাপারের মানুষ।
তিস্তা নদীর আন্তশাখা নদী সতী নদী। তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে আবার তিস্তায় মিলিত হয়েছে নদীটি।
লালমনিরহাটের অন্যতম ওই দীটির গড় প্রস্থ ছিল প্রায় ৫০০ ফুট। দখলের কারণে লালমনিরহাট শহরে বাসস্ট্যান্ডের একটু উজানে নদীটি ৫ থেকে ৭ফুটে পরিণত হয়েছে। নদীটি জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার পারুলিয়া এলাকায় তিস্তা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে একই জেলার আদিতমারী হয়ে সদর উপজেলায় পুনরায় তিস্তা নদীতে মিলিত হয়েছে। মৃত্যুপ্রায় নদীটি সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মরাসতী নদীর অবস্থাও একই। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে রয়েছে সিংগীমারী নদী। জেলার পাটগ্রাম উপজেলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সিংগিমারী নদীতে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। এখানেও অবৈধ দখলে নদীটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। জেলার বুড়িমারী স্থলবন্দরের দিকে যাওয়া পথে বেশ কয়েক কিলোমিটার এ নদী পাশ দিয়ে সড়ক চলে গেছে। নদীটি পাটগ্রামের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। নদীটির ডান তীরের দিকে ভারত। ভারতের চা–বাগান। পাটগ্রাম বাসস্ট্যান্ডের কাছে নদীটির সিংহ ভাগ দখল হয়ে গেছে। পুরানো দখলের সঙ্গে নতুন দখল দারেরা সক্রীয়।নদীতে করা হয়েছে ময়লার ভাগাড়। এই ময়লায় ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে নদী আর ভরাট হওয়া অংশে চলছে দখল। সবার চোখের সামনে নদীর অবৈধ দখল হচ্ছে দেখার যেন কেউ নেই।
ধরলা নদী লালমনিরহাটের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। নদীটিতে ভাঙন আছে। ধরলা বাংলাদেশে দুবার প্রবেশ করেছে। একবার বুড়িমারী স্থলবন্দরের পাশ দিয়ে প্রবেশ করে ভারতে চলে গেছে। পাটগ্রাম দিয়ে আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি কুড়িগ্রাম জেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ধরলা নদীর ওপর দিয়ে ব্রিটিশ আমলে রেল যোগাযোগ ছিল। এখনো সদর উপজেলার মোগলহাট ধরলাপাড়ে পুরোনো স্টেশন চোখে পড়ে। দূর থেকে ভারত সীমান্তে রেলের একটি দৃশ্যমান সেতু দর্শনার্থীদের মন কাড়ে।
লালমনিরহাটের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জেলা নদী রক্ষা কমিটি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন, স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা।
রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ জানান, কোন ব্যক্তির এসব নদীর জমির মালিকানা হওয়ার সুযোগ কোনোকালেই ছিল না। যে সূত্রে ব্যক্তিমালিকানা লাভ করুক না কেন, তা অবৈধ, বেআইনি। ফলে প্রথমেই বাতিল করতে হবে ব্যক্তির মালিকানা। বন্ধ করতে হবে জমির খাজনা-খারিজ। আর অবৈধভাবে দখল হওয়া নদীর জমি উদ্ধার করতে কার্যকর ব্যবস্থা স্থানীয় নদী রক্ষা কমিটিকেই নিতে হবে।
জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহ, রাশেদুল হক প্রধান জানান, নদীগুলো দখলমুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সংকটাপন্ন নদীগুলো পরিস্কার ও পুনঃখননের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে।
এসকে/এসআই