বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যাল চালুর আলোচনা যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানা ঘোষণা, উদ্যোগ ও বৈঠকের পরও সেবা চালু না হওয়ায় বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চয়তায় ছিল। তবে এবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশে পেপ্যালের কার্যক্রম চালু করতে ইতোমধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সরকারের এই সরাসরি অবস্থান বিষয়টিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর উদ্যোগ নতুন নয়। ২০১৬ সালের দিকে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১৭ সালে প্রত্যাশার বিপরীতে চালু হয় কেবল Xoom—যা পেপ্যালের একটি সহযোগী রেমিট্যান্স সেবা। এর মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠাতে পারলেও ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা কখনোই চালু হয়নি।
পরবর্তী বছরগুলোতেও একাধিকবার সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে “পেপ্যাল আসছে”—এই বার্তাটি অনেকের কাছে বারবার শোনা প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পেপ্যাল চালু না হওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক জটিল কারণ।
প্রথমত, দেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের ফাইন্যান্সিয়াল সেটেলমেন্ট ও প্রতারণা প্রতিরোধ অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অনলাইন জালিয়াতি বা বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২৪/৭ কেন্দ্রীয় সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহকের পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই (KYC) প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতা বড় বাধা। বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, যেখানে পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মের জন্য অবাধ ইনফ্লো ও আউটফ্লো প্রয়োজন।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ঘাটতিও একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে পেপ্যালের সঙ্গে যোগাযোগ আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে হওয়ায় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়।
২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পেপ্যাল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে কার্যক্রম চালু করতে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে বৈঠক করেছে।
এছাড়া দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশ—এই দুটি বিষয় পেপ্যালের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী— পেপ্যাল চালুর জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে, হাইটেক পার্ক ও আইসিটি অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের পরিবেশ তৈরির কাজ চলছে।
এসব উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি এখন আর কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
পেপ্যাল চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে:
ফ্রিল্যান্সার খাত:
বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে সরাসরি ও দ্রুত পেমেন্ট গ্রহণ সহজ হবে।
ই-কমার্স ও উদ্যোক্তা:
ছোট ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
রেমিট্যান্স:
প্রবাসীরা সহজে অর্থ পাঠাতে পারলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে।
ডিজিটাল অর্থনীতি:
ক্যাশলেস লেনদেন ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—পেপ্যাল চালু করা কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। এটি একটি জটিল আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও নীতিগত প্রক্রিয়া, যেখানে নিরাপত্তা, বাজার সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবার সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেশি হলেও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতির ওপর।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কি সত্যিই এবার বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু হতে যাচ্ছে?
এম