বিগত দিনে অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদানকে সীমিত করা হয়েছে: মাসুদ খান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৭:২০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: বিগত বছরগুলোতে আমাদের পুঁজিবাজার প্রবৃদ্ধি ও আশাবাদের অনেক সময় অতিক্রম করেছে। তবে একই সঙ্গে এমন কিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করেছে, ভালো মানের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমিয়েছে এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদানকে সীমিত করেছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) বিএসইসির মাল্টিপারপাস হল রুমে যোগদান পরবর্তী আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মাসুদ খান বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অনেক ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একসময় বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন আরও সতর্ক। মিউচ্যুয়াল ফান্ড শিল্প, যা আমাদের পুঁজিবাজারের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও বিনিয়োগকারীদের আস্থা আমরা এই বাস্তবতাগুলো সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করি। তবে আমরা আরেকটি বিষয়ও উপলব্ধি করি। আজকের বাংলাদেশ বিশ বছর আগের বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বড়, শক্তিশালী এবং বহুমাত্রিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের উদ্যোক্তারা বিশ্বমানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। আমাদের বেসরকারি খাত বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে এবং নতুন নতুন ধারণা ও উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে।  নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের অর্থনীতি বারবার তার প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের পুঁজিবাজার অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতেই হবে।

তিনি বলেন, আমাদের ভিশন, আমাদের ভিশন অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর একটি সীমান্ত বাজার (Frontier Market) থেকে Emerging Market এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ-নির্ভর পুঁজিবাজারে রূপান্তর করতে চাই, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূলধন সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে। আজ আমি সেই নীতিমালাগুলো তুলে ধরতে চাই, যা এই কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং যে দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা পুঁজিবাজারকে এগিয়ে নিতে চাই।

আরও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ এবং যেখানে সম্ভব নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ: এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারের পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুশাসিত ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং বাজারের বিকাশকে ধীর করে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারে অসংখ্য রিপোর্টিং বাধ্য বাধকতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া, দাখিলপত্র এবং কমপ্লায়েন্স প্রয়োজনীয়তা যুক্ত হয়েছে। এসবের অনেকগুলোই পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। বিনিয়োগকারী সুরক্ষা অক্ষুণ্ণ রেখে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কমিশন বিদ্যমান বিধিমালা, রিপোর্টিং প্রয়োজনীয়তা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার একটি ব্যাপক পর্যালোচনা করবে।

ডিজিটাইজেশন: আধুনিক পুঁজিবাজার কাগজ নির্ভর প্রক্রিয়া এবং ম্যানুয়াল কার্যপ্রবাহের মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হতে পারে না। তাই ডিজিটাইজেশন আমাদের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হবে। আমরা ধাপে ধাপে পুরো পুঁজিবাজার ইকোসিস্টেমকে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনতে চাই। এর মধ্যে থাকবে নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার তদারকি, আইন প্রয়োগ এবং বিনিয়োগকারী সেবা। আইপিও আবেদন, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক আবেদন, লাইসেন্সিং কার্যক্রম এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক দাখিলপত্র ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হবে। আমরা চাই বিনিয়োগকারী এবং কোম্পানিগুলো যেন নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে, দক্ষতার সঙ্গে এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা হবে দ্রুততর, অধিক স্বচ্ছ, অধিক দক্ষ এবং অংশীজনদের জন্য অধিকতর সহজলভ্য। প্রযুক্তি যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমায়, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে এবং নিয়ন্ত্রক সম্পদকে অধিক মূল্য সংযোজনকারী তদারকি কার্যক্রমে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে।

ভালো মানের সিকিউরিটিজের সরবরাহ বৃদ্ধি: বর্তমানে আমাদের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঘাটতি। বাংলাদেশের অনেক শক্তিশালী ও সফল কোম্পানি এখনও পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে। বাংলাদেশে সফলভাবে পরিচালিত বহু বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত নয়। অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও এখনও বাজারের বাইরে রয়েছে। একইভাবে, অনেক সফল স্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান জন সাধারণের মালিকানা ভিত্তিক কোম্পানি হওয়ার উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এখনও ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী পুঁজিবাজারের জন্য প্রয়োজন ভালো মানের সিকিউরিটিজের পর্যাপ্ত সরবরাহ। তাই আমরা বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ স্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করব এবং তাদের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করব। আমরা একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ডাইরেক্ট লিস্টিং কাঠামো প্রবর্তনের উদ্যোগ নেব, যার মাধ্যমে উপযুক্ত কোম্পানিগুলো নতুন মূলধন সংগ্রহ ছাড়াই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। আমাদের লক্ষ্য হলো দ্রুত ভালো মানের সিকিউরিটিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা। একই সঙ্গে আমরা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করব যাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সৃষ্টি: দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিকে একটি সুযোগ হিসেবে নয়, বরং একটি বাধ্য বাধকতা হিসেবে দেখেছে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমরা সরকার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে একটি সমন্বিত “তালিকাভুক্ত কোম্পানি সুবিধা কর্মসূচি” (Listed Company Advantage Programme) প্রণয়নের উদ্যোগ নেব।

এর আওতায় থাকতে পারে—
তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর হারের আরও বড় পার্থক্য; পৃথক কর প্রশাসন ব্যবস্থা; ঝুঁকিভিত্তিক কর মূল্যায়ন; অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত অডিট হ্রাস; দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা; মূলধন সংগ্রহের সহজতর প্রক্রিয়া; দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা; এবং অন্যান্য নীতিগত সুবিধা। এসব সুবিধার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উচ্চতর সুশাসন ও তথ্য প্রকাশের মানকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

কর্পোরেট বাংলাদেশের প্রতি আমাদের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট— একটি ভালো কোম্পানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হওয়া উচিত।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালী করণ: বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও ব্যাপকভাবে খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ উন্নত পুঁজিবাজারে পেনশন তহবিল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা কোম্পানি, মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাজারে স্থিতিশীলতা, তারল্য এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ করে। আমরা মিউচ্যুয়াল ফান্ড শিল্পকে আরও শক্তিশালী করব। প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি তহবিলের পেশাদার ব্যবস্থাপনা উৎসাহিত করব। বীমা খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করব। এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেব। আমরা এটিও স্বীকার করি যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড শিল্পের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

সেই লক্ষ্যে আমরা— সুশাসন জোরদার করব; স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করব; ন্যায্য সম্পদ মূল্যায়ন নিশ্চিত করব; এবং শিল্পজুড়ে জবাবদিহিতা বাড়াব। 

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ: বিদেশি বিনিয়োগ শুধু মূলধনই নিয়ে আসে না; এটি শৃঙ্খলা, সুশাসনের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও নিয়ে আসে। আমরা বুঝতে পারি যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুশাসন, তথ্য প্রকাশ, মুনাফা প্রত্যাবাসন (repatriation) এবং বাজারচর্চা নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। আমরা এসব উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব এবং পদ্ধতিগত ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেব।

যেমন-তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করব; স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করব; আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করব; এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে বাজারে প্রবেশাধিকার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করব। 
বাংলাদেশ বৈশ্বিক (Frontier) ও (Emerging) বাজারভিত্তিক বিনিয়োগ প্রবাহের অনেক বড় অংশ পাওয়ার যোগ্য। 

বাজার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ: আমরা বিনিয়োগকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বাজার মধ্যস্থতাকারী, স্টক এক্সচেঞ্জ, পেশাজীবী সংগঠন এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হতে চাই। আমরা শুনব। আমরা পরামর্শ করব। আমরা গঠনমূলক সমালোচনার প্রতি উন্মুক্ত থাকব। আমরা বিশ্বাস করি, একটি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বাজার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।

সেই লক্ষ্যে কমিশন সকল অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখবে, তাদের উদ্বেগ ও মতামত জানবে, বাজার উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করবে এবং যৌক্তিক সমস্যাগুলোর সময়োপযোগী ও গঠনমূলক সমাধানে কাজ করবে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলতে চাই। পরামর্শ ও সংলাপের অর্থ এই নয় যে বাজারের সততা বা শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে। আমরা বাজার শৃঙ্খলা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং সিকিউরিটিজ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ: আমরা যখন এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করব, তখন বাজারের সততা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর তদারকি ও আইন প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সেই কারণে আমরা বাজার তদারকি এবং আইন প্রয়োগ ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করব। আমরা BSEC, DSE, CSE এবং CDBL-কে সমন্বিত করে একটি আধুনিক নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলব, যেখানে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা থাকবে। যদিও তদারকি পুরো বাজারজুড়ে পরিচালিত হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটিজের ওপর, যেখানে সুশাসন, তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা সংক্রান্ত ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প স্কিম, ফ্রন্ট রানিং এবং অন্যান্য বাজার কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ড আরও দ্রুত শনাক্ত করা হবে, আরও গভীরভাবে তদন্ত করা হবে এবং আরও কার্যকরভাবে শাস্তির আওতায় আনা হবে। যেখানে বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, তথ্য ফাঁস বা গুরুতর তথ্য প্রকাশজনিত ব্যর্থতার যৌক্তিক সন্দেহ দেখা দেবে, সেখানে BSEC-এর তত্ত্বাবধানে স্টক এক্সচেঞ্জসমূহকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হবে, যার মধ্যে প্রয়োজনবোধে সাময়িকভাবে লেনদেন স্থগিত করাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তদারকি কার্যক্রমের আওতায়, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড শনাক্ত হলে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও বাজারের সততা রক্ষার প্রয়োজন হলে, তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
আমি একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলতে চাই।

মাসুদ খান বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য বাজারের স্বাভাবিক উত্থান-পতন ঠেকানো নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হলো ন্যায্য মূল্য আবিষ্কার (Fair Price Discovery) এবং তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার। কারসাজি নয়। সৎ বিনিয়োগকারী এবং সৎ ব্যবসায়ীদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু যারা বিনিয়োগকারীদের আস্থার অপব্যবহার করবে, বাজারে কারসাজি করবে অথবা সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর আইন প্রয়োগের মুখোমুখি হতে হবে। 

দায়িত্বশীলভাবে বাজারের উন্নয়ন: বন্ড, সুকুক, ETF, REIT, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ এবং ডেরিভেটিভস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এসব পণ্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখনও একটি ফ্রন্টিয়ার মার্কেট। আমাদের দায়িত্ব শুধু নতুন পণ্য চালু করা নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো সঠিক সময়ে, সঠিক ক্রমধারায় এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলে এসব পণ্য বাজারে নিয়ে আসা। আমরা বিশ্বাস করি, একটি সফল পুঁজিবাজারের উন্নয়ন একটি যৌক্তিক ও টেকসই ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে। প্রথমে আরও স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ। তারপর ডিজিটাইজেশন। তারপর ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি। তারপর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ শক্তিশালীকরণ। তারপর বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। তারপর আরও শক্তিশালী বাজার তদারকি ও আইন প্রয়োগ। এবং এরপর ধারাবাহিকভাবে সুশাসন ও স্বচ্ছতার আরও উন্নয়ন। একই সঙ্গে বাজারের বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা বন্ড, সুকুক, ETF, REIT এবং অন্যান্য আর্থিক পণ্যের উন্নয়ন অব্যাহত রাখব।
আমাদের লক্ষ্য কেবল নতুন পণ্য চালু করা নয়; বরং সেগুলোকে এমনভাবে প্রবর্তন করা, যাতে দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো সফল, কার্যকর এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য উপকারী হয়ে ওঠে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষা: বিনিয়োগকারী সুরক্ষা আমাদের নিয়ন্ত্রক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।  আমরা যে প্রতিটি সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করব, তার সফলতা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে— এটি কি বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করছে? আমরা তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করব। অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করব। বিনিয়োগকারী শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করব। এবং নিশ্চিত করব যে বিনিয়োগকারীরা সময়োপযোগী, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে পেতে পারেন। একটি ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর পুঁজিবাজার তখনই গড়ে উঠতে পারে, যখন বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করবেন যে তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত এবং বাজারের নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা নীতিগতভাবে বিশ্বাস করি যে দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কোনো স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে, যাতে বাজার স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়ায় ফিরে যেতে পারে

এএইচ/পিএস