মাথাপিছু আয় ৪৫৯১ ডলার করতে চায় সরকার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৬, ১০:৫০ এএম
ফাইল ছবি

ঢাকা: আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার ও প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘Transforming Economy from Fragility to Prosperity’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সরকারের আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬–২৭ থেকে ২০৩০–৩১ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ের জন্য তৈরি করা প্রতিবেদনটি বুধবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশ করা হয়।

[274712]

জিইডির হিসাবে, বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২ হাজার ৯৫৮ ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরের পরিকল্পনা শেষে এই আয় ১ হাজার ৬৩৩ ডলার বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে, মাথাপিছু আয়কে ব্যক্তির হাতে থাকা বা ব্যক্তির একক আয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের অভ্যন্তরে অর্জিত আয় ও প্রবাসী আয়সহ জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু গড় আয় হিসাব করা হয়।

তিন ধাপে অর্থনীতির রূপান্তর
জিইডি আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছে। পরিকল্পনার প্রথম বছরকে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার বছর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময়ে বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রথম থেকে তৃতীয় বছরকে পুনঃস্থাপনের পর্যায় হিসেবে ধরা হয়েছে। এ সময়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়কে আরো কার্যকর করা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরকে পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সময়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিবেদনে ব্যাংকিং, রাজস্ব, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য
উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জিইডি। আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ২০৩০–৩১ অর্থবছরে ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। জিইডির পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ২০৩০–৩১ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেওয়া হবে।

ব্যাংক খাতে তিন ধাপে সংস্কার
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও তদারকির ঘাটতি কাটিয়ে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জিইডির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক, খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারীদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

পরবর্তী দুই বছরে ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায়ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি আর্থিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে। শেষ ধাপে ব্যাংকগুলোকে আরো দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, তথ্যব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বাধীনতা বাড়াতে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে
রাজস্ব খাতেও বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করেছে সরকার। জিইডির প্রতিবেদনে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব আদায় বিভাগ আলাদা করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া একক ভ্যাট হার চালু, করছাড় কমানো, ছোট ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনা এবং কর প্রদানব্যবস্থা ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০৩০–৩১ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

যোগাযোগে রেলকে গুরুত্ব
আগামী পাঁচ বছরে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ–কুমিল্লা–লাকসাম–ফেনী কর্ডলাইন নির্মাণ এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত ও বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া, ঢাকা–পঞ্চগড় এবং ঢাকা–চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলপথ ডাবল লাইন করার উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রেল যোগাযোগের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল, কমিউটার রেল ও মনোরেল চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা
তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে জিইডি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫৬০ জন তরুণকে স্টার্টআপ ফান্ড থেকে অর্থ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর ১ হাজার ২০০ নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সুশাসনকে অর্থনৈতিক সংস্কারের ভিত্তি
অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য সুশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেছে জিইডি। সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

জিইডির মতে, কার্যকর সুশাসন কাঠামো থাকলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কার্যকর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি পরিচালনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা সহজ হয়।

এসআই