আস্থার সংকটেই বড় পতন, ৩৩ দিনে ডিএসইএক্স কমল ৪৮৫ পয়েন্ট

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ১১:২২ পিএম

দেশের শেয়ারবাজারে আবারও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। টানা দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমে এসেছে সাড়ে তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সর্বশেষ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) এক দিনেই সূচকটি কমেছে প্রায় ৯৬ পয়েন্ট। লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩৬টিরই শেয়ারদর কমেছে। ফলে স্পষ্ট হয়েছে, এটি কয়েকটি কোম্পানির দরপতন নয়; বরং বাজারজুড়ে ব্যাপক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, রোববার ডিএসইএক্স ৯৬ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৪১৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। একই দিন ডিএসইএস সূচক কমেছে ১৯ পয়েন্ট এবং ডিএস৩০ কমেছে ২৩ পয়েন্ট। মোট ২৩ কোটি ৬৫ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছে এবং লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৭১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ২৭টি প্রতিষ্ঠানের।

এর আগে গত ১১ আগস্ট ডিএসইএক্স উঠেছিল ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টে। সেখান থেকে সর্বশেষ অবস্থানে সূচকটি কমেছে ৪৮৫ পয়েন্ট বা প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাজারের বড় একটি অংশের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ৭ সেপ্টেম্বর এক দিনেই সূচক কমেছিল ১০৩ পয়েন্ট এবং বাজার মূলধন কমেছিল প্রায় ৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা।

প্রথম কারণ জ্বালানি সংকট-

বর্তমান পতনের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হচ্ছে দীর্ঘায়িত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিক্রি, উৎপাদন ব্যয়, মুনাফা ও নগদ প্রবাহে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু কোনো কোম্পানির অতীত মুনাফা দেখছেন না; ভবিষ্যতে সেই কোম্পানি কতটা মুনাফা করতে পারবে, সেটিও বিবেচনা করছেন। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘ হলে শিল্প খাতের উৎপাদন ও করপোরেট আয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে—এই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমেছে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট-

বাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন ‘আস্থা’। গত কয়েক সপ্তাহের পতনে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছেন, বাজারে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর মতো শক্তিশালী কোনো ইতিবাচক অনুঘটক নেই।

ফলে নতুন অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেকেই হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে নগদ অর্থ ধরে রাখছেন। এ অবস্থায় ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতা বেড়ে গেলে সূচকে দ্রুত পতন হয়। ১৩ সেপ্টেম্বরের লেনদেনেই ৩৩৬টি প্রতিষ্ঠানের দর কমে যাওয়াই তার বড় প্রমাণ।

তৃতীয় কারণ বড় বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা-

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বড় লেনদেন ও ব্রোকারেজ হাউসের কার্যক্রম নিয়ে ডিএসইর নজরদারি বেড়েছে। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসকে বড় অঙ্কের শেয়ার লেনদেনের তথ্য দিতে বলা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন বা তদন্তের উদ্যোগ বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করেছে।

ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) পক্ষ থেকেও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, বড় লেনদেন নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠায় কিছু বড় বিনিয়োগকারী আপাতত বাজারের বাইরে অবস্থান করছেন। এর ফলে বাজারে তারল্য ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বাজার কারসাজি বা অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য নয়। বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের নজরদারিতে বাজার পতনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সন্দেহজনক লেনদেন ধরা পড়েনি এবং বাজার মূলত চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই চলছে।

আগের উত্থানের পর বড় ধরনের সংশোধন-

জুনের পর বাজারে নতুন নিয়ন্ত্রক নেতৃত্বকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সংস্কার, বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের আশায় বাজার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ২২ জুনের ৫ হাজার ৫৫৪ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান থেকে ডিএসইএক্স আগস্টে ৫ হাজার ৯০০-এর ঘরে ওঠে।

কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতি ধীর হওয়া এবং বাজারের মৌলিক সমস্যাগুলো বহাল থাকায় সেই উত্থান টেকসই হয়নি। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় এখন সেই উত্থানের একটি বড় অংশের সংশোধন হচ্ছে।

কোম্পানির আয় ও মুনাফা নিয়ে শঙ্কা-

শেয়ারবাজারের সূচক শেষ পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ও মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি ব্যয়, ভোক্তা চাহিদা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ করপোরেট আয় নিয়ে সতর্ক।

এ কারণে ব্যাংক, বীমা, বস্ত্র, ওষুধ, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে বিক্রির চাপ দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ রোববার সবগুলো খাতই নেতিবাচক অবস্থায় ছিল। ভ্রমণ, সিরামিক ও পাট খাতে পতন ছিল তুলনামূলক বেশি।

বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ দুর্বল-

সূচক যখন বাড়ছিল, তখনও বাজারের দৈনিক লেনদেন ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় শক্তিশালী ছিল না। পরবর্তী সময়ে পতনের সঙ্গে সঙ্গে লেনদেনও দুর্বল হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন আগের দিনের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কমে ৫২০ কোটি টাকায় নেমেছিল।

অর্থাৎ বাজারে এখন একই সঙ্গে দুটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে—বিক্রির চাপ বাড়ছে এবং নতুন ক্রেতা কমছে। এই পরিস্থিতিই সূচকের পতনকে আরও তীব্র করছে।

বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা-

বর্তমান পতনের বাইরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি একটি সমস্যা হলো ভালো ও বড় কোম্পানির স্বল্পতা। দেশের অর্থনীতির তুলনায় পুঁজিবাজারের গভীরতা অনেক কম। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজার মূলধন-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ শতাংশ, যা আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। বড় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক কোম্পানি এখনো পুঁজিবাজারের বাইরে।

ফলে বাজার কয়েকটি বড় কোম্পানি ও সীমিতসংখ্যক সক্রিয় শেয়ারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এসব কোম্পানিতে বিক্রির চাপ বাড়লে পুরো সূচক দ্রুত নিচে নেমে যায়।

তাহলে কি এটি বড় ধরনের ধস?

বর্তমান পতনকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ‘মার্কেট ক্র্যাশ’ বলা ঠিক হবে না। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি গভীর সংশোধন এবং আস্থার সংকট। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পতনের সময় বাজারের অংশগ্রহণ অত্যন্ত নেতিবাচক হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ দিনে ৩৩৬টি শেয়ার কমেছে, বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ২৭টি। এর অর্থ বাজারে পতনটি শুধু সূচকভিত্তিক নয়; বিস্তৃত শেয়ারজুড়ে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।

সামনে ঘুরে দাঁড়াবে কী?

বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সূচকের স্থায়ী ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের দৃশ্যমান সমাধান দরকার। দ্বিতীয়ত, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা নিয়ে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হতে হবে। তৃতীয়ত, বড় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক ও স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বাজারে নতুন অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। ভালো মৌলভিত্তির নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো, মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে কার্যকর করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারকে আরও সহজ ও গভীর করার মতো সংস্কারও জরুরি।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পতনের মূল কারণ একক কোনো ঘটনা নয়। জ্বালানি সংকট বাজারের মৌলিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে, আস্থার সংকট বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে, নিয়ন্ত্রক তৎপরতা বড় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে এবং আগের প্রত্যাশাভিত্তিক উত্থানের পর শুরু হয়েছে বড় ধরনের সংশোধন। এর সঙ্গে দুর্বল তারল্য ও বাজারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়ে পতনকে আরও তীব্র করেছে।

ফলে এখন সূচক কোথায় থামবে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কীভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে। আস্থা না ফিরলে সাময়িকভাবে সূচক বাড়লেও সেটি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর আস্থা ফিরলে বর্তমান পতনই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন করে সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এসএইচ