ঢাকা: তালিকাভুক্ত সাধারণ বীমা কোম্পানি ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের প্রায় ১২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষায় ৪৬টি ব্যাংকে রাখা এসব এফডিআরের অস্তিত্ব ও মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। এর মধ্যে আর্থিকভাবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকে কোম্পানিটির প্রায় ২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আমানত রয়েছে। এসব অর্থের আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সম্ভাব্য ইমপেয়ারমেন্ট প্রভিশন বা লোকসানের বিপরীতে কোনো অর্থ আলাদা করে রাখেনি কোম্পানিটি।
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নিরীক্ষকের দেওয়া মতামতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৪৬টি ব্যাংকে রাখা কোম্পানিটির প্রায় ১২০ কোটি টাকার এফডিআর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এই অর্থ কোম্পানিটির নগদ ও নগদ সমতুল্য সম্পদের প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক। ফলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো এসব আমানতের অস্তিত্ব, মূল্য ও আদায়যোগ্যতা নিয়ে নিরীক্ষা পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে নিরীক্ষায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে পাঁচটি আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের বিনিয়োগের বিষয়টি। এসব ব্যাংকে কোম্পানিটির ২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে।
নিরীক্ষকের মতে, এসব বিনিয়োগের অর্থ পুনরুদ্ধার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তারপরও কোম্পানিটি এ অর্থের বিপরীতে কোনো ইমপেয়ারমেন্ট প্রভিশন করেনি। এতে কোম্পানির সম্পদের মূল্য বাস্তবের তুলনায় বেশি দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ব্যাংকে রাখা আমানত থেকে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা সুদ আয় হিসেবে দেখিয়েছে। তবে ওই সুদ আদায়যোগ্য কি না, তা নিয়েও নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে।
শেয়ারবাজারের লোকসানের হিসাবেও অসংগতি: ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের বিনিয়োগ হিসাবেও অসংগতি পেয়েছেন নিরীক্ষক। কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকার অনাদায়ী লোকসান যথাযথভাবে হিসাব করেনি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোম্পানিটির বিনিয়োগসংক্রান্ত রেকর্ডের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। ফলে বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য ও আর্থিক প্রতিবেদনে এর যথাযথ প্রতিফলন হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত নথিপত্র ও প্রমাণের অভাবে কোম্পানিটির বীমা দাবি দায়, প্রিমিয়াম আয়, গ্র্যাচুইটি দায় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক হিসাবমান ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পরিপালনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ঘাটতির বিষয় নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে এসেছে।
কোম্পানিটির দেখানো সম্পদের বড় অংশ নিয়েই প্রশ্ন: ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের মোট সম্পদের বড় একটি অংশ ব্যাংক আমানত ও বিনিয়োগে রয়েছে। কিন্তু এসব অর্থের একটি বড় অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে না পারা এবং আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকে রাখা অর্থের বিপরীতে কোনো ইমপেয়ারমেন্ট না রাখার বিষয়টি কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ১২০ কোটি টাকার এফডিআরের মধ্যে প্রায় ২৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আর্থিকভাবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকে থাকার তথ্য এবং ওই অর্থের আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিরীক্ষকের মতামতের এসব পর্যবেক্ষণ ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের ব্যাংক আমানতের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের মান, সম্পদের প্রকৃত মূল্য এবং আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির মোট সম্পদের বড় অংশ যদি ব্যাংক আমানত ও বিনিয়োগে থাকে, কিন্তু সেগুলোর অস্তিত্ব, মূল্য ও আদায়যোগ্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা না যায়, তাহলে আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
১২০ কোটি টাকার এফডিআরের অস্তিত্ব নিয়ে নিরিক্ষকের শঙ্কা বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হাসান তারেক সোনালী নিউজকে বলেন, ‘আমাদের যেসব ব্যাংকে এফডিআর রয়েছে, নিরীক্ষা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কোম্পানির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েকটি ব্যাংক থেকে নির্ধারিত সময়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণেই নিরীক্ষক তাঁদের প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে দেরিতে পাওয়া তথ্যগুলো নিরীক্ষকদের সরবরাহ করা হয়েছে।’
তবে নিরীক্ষক তাঁদের প্রতিবেদনে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে দেরির কথা উল্লেখ না করে সংশ্লিষ্ট এফডিআরের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান তারেক বলেন, ‘মূল বিষয়টি হলো, নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়ায় নিরীক্ষকরা আর অপেক্ষা করেননি। তবে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলো থেকে পাওয়া তথ্য আমরা তাঁদের সরবরাহ করেছি।’
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে থাকা আমানত নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই পাঁচটি ব্যাংকের বিষয়টি এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে আমাদেরও খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। ব্যাংকগুলোর ভুক্তভোগী শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো দেশের মানুষ।’
এএইচ/পিএস