ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট বাড়ছে ৭৪ শতাংশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
ফাইল ছবি

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেন ও কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহের গতি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এক বছরেই বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছে জমা পড়া এমন প্রতিবেদনের সংখ্যা প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যানটি একই সাথে দুটি বার্তা দেয়। প্রথমত, আর্থিক খাতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নজরদারি ও শনাক্তকরণ ক্ষমতা আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিএফআইইউর কাছে ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কর্মকাণ্ডের রিপোর্ট জমা পড়েছে। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৪৫টি। পাঁচ বছরের হিসাব দেখলে এই বৃদ্ধির মাত্রা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে রিপোর্ট ছিল মাত্র পাঁচ হাজার ২৮০টি, সেখানে আজ তা প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে।

তবে রিপোর্ট বৃদ্ধি পাওয়া মানেই দেশে আর্থিক অপরাধ সমহারে বেড়েছে, এমনটা ভাবা সঠিক নয়। প্রযুক্তিগত তদারকি বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি এবং অনলাইন জুয়া, ক্রিপ্টোকালচার ও ডিজিটাল হুন্ডির মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়াও এই বৃদ্ধির বড় কারণ। ব্যাংকগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। ফলে মোট রিপোর্টের প্রায় ৯৫ শতাংশই আসছে ব্যাংকিং খাত থেকে।

বিএফআইইউ এসব রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে শেষ অর্থবছরে ১৯৯টি প্রস্তুতকৃত আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠিয়েছে। এসব প্রতিবেদনের সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে দুর্নীতি ও ঘুষের বিষয়। পাশাপাশি রয়েছে প্রতারণা, করসংক্রান্ত অপরাধ এবং মুদ্রা চোরাচালান। সরকারি সংস্থাসমূহ, বিশেষ করে দুদক ও সিআইডির পক্ষ থেকেও আর্থিক তথ্যের চাহিদা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

একই সাথে দেখা যাচ্ছে, সনাতন বা নগদ টাকার বড় লেনদেনের রিপোর্ট কিছুটা কমেছে। এর কারণ আর্থিক খাত দিন দিন ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। তবে নগদ লেনদেন কমলেও অপরাধের ঝুঁকি কমেনি, বরং অপরাধের ধরণ বদলে গেছে। এখন নতুন প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ সরানোর চেষ্টা বাড়ছে।

আর্থিক অপরাধ দমনে মূল চ্যালেঞ্জ এখন তথ্য পাওয়ার পর তা চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছানো। ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক সংকেত থেকে বিএফআইইউ মাত্র ১৯৯টি গভীর গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এটি একটি স্বাভাবিক বাছাই প্রক্রিয়া। তবে এই ১৯৯টি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কতটি মামলা হলো, কত টাকা জব্দ বা ফ্রিজ হলো এবং চূড়ান্ত বিচারে কত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত এলো, সেই হিসাবটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দুদক ও বিএফআইইউ যৌথভাবে বিভিন্ন মামলায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ ফ্রিজ বা ক্রোক করার তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সম্পদ ফ্রিজ করা বা আদালতের জরিমানের আদেশ হওয়া আর বাস্তবে সেই অর্থ উদ্ধার হওয়ার মধ্যে বড় আইনি ব্যবধান রয়েছে। প্রতিটি মামলার চূড়ান্ত ফল বা উদ্ধারকৃত অর্থের সঠিক হিসাব একক কোনো জায়গায় পাওয়া কঠিন।

একটি কার্যকর অর্থপাচারবিরোধী ব্যবস্থার প্রধান শর্ত হলো তথ্য প্রবাহকে সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও বিচারে রূপ দেওয়া। প্রতিটি সন্দেহজনক সংকেত থেকে শুরু করে অর্থ উদ্ধার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছ হিসাব থাকা প্রয়োজন। কেবল রিপোর্টের সংখ্যা কিংবা প্রাথমিক আইনি ব্যবস্থার খবর দিয়ে সাফল্য মাপা সম্ভব নয়। রিপোর্ট তৈরি দিয়ে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হয়, অপরাধীর শাস্তি এবং পাচার হওয়া অর্থ বাস্তবে ফেরত আনার মাধ্যমেই তার সফল সমাপ্তি ঘটে।

এসএইচ