ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান, ঢাকা ৬ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বোর্ড পরিচালনায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
আইডিআরএর গত বুধবার (২৮ অক্টোবর)-এর চিঠিতে বলা হয়েছে, পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মনিরা বেগম ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আইডিআরএর উপপরিচালক (নন-লাইফ) মো. সোলায়মান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বীমা আইন, ২০১০-এর ৫১(গ) ধারা অনুযায়ী এ নিয়োগের কথা জানানো হয়।
চিঠি অনুযায়ী, পর্যবেক্ষক পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত থেকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো আইডিআরএকে অবহিত করবেন। তবে সভায় তাঁর ভোটাধিকার থাকবে না এবং তিনি কোনো সিদ্ধান্ত বা মতামত দিতে পারবেন না। কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবকে পর্যবেক্ষকের জন্য সভার কার্যপত্রসহ নিয়মিত আমন্ত্রণ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আইডিআরএর এ পদক্ষেপের মধ্যেও ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদে সাঈদ খোকন ও তাঁর পরিবারের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আত্মগোপনে থাকলেও অজ্ঞাত স্থান থেকে কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বোর্ডের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছেন তিনি।
কোম্পানির সর্বশেষ বোর্ড কার্যক্রম নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত কোম্পানির ২৫৩তম বোর্ড সভায় সাঈদ খোকন ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেন। ওই সভায় নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে তাঁর চাচা ঈসমাইল নওয়াবকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, সভায় তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যানও অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে ঈসমাইল নওয়াব সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং নিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাতেই নিজেকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। এ প্রক্রিয়ার বৈধতা ও বোর্ড পরিচালনার নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোম্পানির উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের একটি অংশ।
জানা যায়, ওই সভায় সাঈদ খোকন পরিবারের সদস্য পরিচালকরা অনুপস্থিত থাকায় তাদের বিকল্প ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ২৫৪ তম সভাতেও তাদের পরিবর্তে অংশ নেন বিকল্প ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাঈদ খোকন দীর্ঘদিন কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলেও বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। তাঁর হয়ে ঈসমাইল নওয়াব কোম্পানির কার্যক্রমে ভূমিকা রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত: সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স লঙ্ঘন, বোর্ড পরিচালনায় অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে পৃথক তদন্ত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও আইডিআরএ।
সাত উদ্যোক্তা পরিচালকের অভিযোগের পর গত বছরের ৯ নভেম্বর বিএসইসি চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তের আওতায় আসে চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ ১৩ বছর দায়িত্ব পালন, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উদ্যোক্তা পরিচালক অপসারণ, পরিবারের সদস্যদের পরিচালক নিয়োগ, কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও অপসারণ এবং আত্মগোপনে থেকে কোম্পানি পরিচালনার অভিযোগ।
এ ছাড়া কোম্পানি আইন, বীমা আইন, সিকিউরিটিজ আইন ও করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্তের বিষয়বস্তু করা হয়।
একই বিষয়ে গত বছরের ১৩ নভেম্বর আইডিআরএ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানিকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।
বিএসইসিতে দেওয়া অভিযোগে সাত উদ্যোক্তা পরিচালক দাবি করেন, ২০১২ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর সাঈদ খোকন কোম্পানিতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের অভিযোগ, সাতজন স্পন্সর পরিচালককে অপসারণ করে তাঁদের স্থলে চেয়ারম্যান তাঁর পরিবারের সদস্য এবং নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এর ফলে পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে কোম্পানির প্রায় ৩০ দশমিক ৩৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চেয়ারম্যান নিজের সিদ্ধান্তে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিব নিয়োগ এবং অপসারণ করেছেন। এসব কার্যক্রমে কোম্পানির সচিব ও পরিচালক নুর মোহাম্মদ মামুন সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
এসএইচ