রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ১০৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্যাম্পাসে সব ধরনের লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শুরু থেকেই ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে ছাত্রদল। অন্যদিকে, ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন অন্য ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সম্প্রতি প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতায় প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, শুরু থেকেই ছাত্রদল প্রকাশ্যে রাজনীতি করে আসছে। ইফতার মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রশাসনের উপস্থিতিও দেখা গেছে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জাতীয়তাবাদী ফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
ছাত্রশিবিরের নেতারা বলছেন, তারা শুরু থেকেই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে দলীয় পরিচয়ে কোনো কর্মসূচি পালন করেননি। কিন্তু যখন দেখা যাচ্ছে ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন, তখন শুধু শিবিরের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়াকে তারা বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের দাবি, রাজনীতি করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। তাদের মতে, ক্যাম্পাসে রাজনীতি না থাকলে গণতন্ত্রচর্চা বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সাংবিধানিক অধিকার হরণ করার সুযোগ কারও নেই।
প্রশাসনের দৃষ্টিগোচরে এসব কর্মসূচি চললেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, যদি রাজনীতি নিষিদ্ধই হয়, তাহলে ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে সবাই কীভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে? প্রশাসন একদিকে অনুমতি দিচ্ছে, আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেরাও অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছে। তাহলে একে নিষিদ্ধ বলার যৌক্তিকতা কোথায়—এমন প্রশ্ন তুলছেন তারা।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রিশাদ নূর বলেন, সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের চাহিদার ভিত্তিতেই হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দেখেছে, তাদের ভাই নিহত হয়েছে, বন্ধু কারাগারে গেছে, ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে নির্যাতন, দখল ও লুটপাট চলেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা প্রতিবাদ জানিয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তোলে। এখন কিছু নতুন রাজনৈতিক মুখ পুরোনো সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চায়, কারণ সেখানে ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাব রয়েছে। আমরা চাই না অতীতের সেই পরিস্থিতি আবার ফিরে আসুক।
ছাত্রশিবিরের সভাপতি সুমন সরকার বলেন, আমাদের রাজনীতি শিক্ষার্থীদের জন্য। শিক্ষার্থীরা যদি না চায়, তাহলে আমরা কোনো কর্মসূচি করব না। তবে আমরা দেখেছি, শুরু থেকেই ছাত্রদলের নেতারা সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে। প্রশাসন যদি ব্যবস্থা নেয়, তাহলে আগে যারা নিয়ম ভেঙেছে, তাদেরও তারিখ অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন বলেন, অতীতে ছাত্রলীগের বাধার কারণে সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু কোনো একটি সংগঠনের অপকর্মের দায়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও গঠনমূলক রাজনীতি বন্ধ থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হয়তো কিছু অনিয়ম আড়াল করতেই রাজনীতি বন্ধ রেখেছিল। এখন সময় এসেছে সুস্থ ও ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালু করার। একই সঙ্গে যারা অপরাজনীতি করবে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ রয়েছে। এর আগে ছাত্রদল একটি কর্মসূচি করেছে, যা তাদের করা ঠিক হয়নি। ইফতার মাহফিলের বিষয়টি মানবিক দিক বিবেচনায় তখন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সেই ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে ছাত্রশিবির বলছে, ছাত্রদল একটি কর্মসূচি করেছে, তাই তারাও কর্মসূচি করবে। তবে এর পর আর কাউকে এমন সুযোগ দেওয়া হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে, ততক্ষণ ক্যাম্পাসের ভেতরে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না—এটা নিশ্চিত।
এম