শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা বাস্তবায়নে মাঠে শিক্ষা প্রশাসন

  • নিউজ ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১১:০১ এএম

শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি প্রণয়ন, আকর্ষণীয় পাঠদান নিশ্চিত ও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৫দফা অনুশাসন বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে শিক্ষা প্রশাসন।-বাসস

কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, সারা দেশে স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন, ক্লাসরুমে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের পাঠদানের লাইভ মনিটরিং, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক ও পুরস্কারের ব্যবস্থা এবং একটি ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর বিষয়ে শিক্ষা প্রশাসন মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে ।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।’

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অনুশাসনগুলো বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ইতোমধ্যেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

আবদুল খালেক আরও বলেন, অনুশাসনগুলো একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী দৃশ্যমান করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে বলা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বাসস’কে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আচরণবিধি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি খসড়া পরিমার্জন করে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।

সম্প্রতি অতিমাত্রায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার অভাবে শিক্ষকরা দায়িত্বহীন হয়ে পড়ছেন এবং ফলাফল বিপর্যয় ঘটছে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বাসস’কে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলাফল খারাপ হওয়ার জন্য শিক্ষকরা তাদের দায় এড়াতে পারেন না। বিগত দিনে দেখা গেছে শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হয়েছেন বেশি। ফলে সার্বিক ফলাফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। 

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের রাজনীতিমুক্ত রাখা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এখন সময়ের দাবি।’

যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২৮ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে আসেন এবং একটি পর্যালোচনা সভায় অংশ নেন। 

সভায় তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষক দক্ষতা ও শিক্ষা খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের উন্মুক্ত মতামত ও প্রস্তাবনা দেওয়ার নির্দেশনা দেন।

সভায় কার্যপত্র অনুযায়ী, উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আনন্দময় শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিং নির্ভরতা ও স্মার্টফোন আসক্তির কারণে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তার স্বার্থে কর্মজীবী অভিভাবকদের সন্তানদের কওমি মাদ্রাসায় পাঠানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব সংকট নিরসনে কর্মকর্তারা শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি বন্ধে আচরণবিধি সংশোধন, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে ‘শিক্ষক পুল’ গঠন, প্রশিক্ষণ মূল্যায়নে ‘এন্ড-লাইন সার্ভে’, সিসি ক্যামেরায় পাঠদানের কেন্দ্রীয় তদারকি, ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালু ও অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনার সুপারিশ করেন। 

এসব প্রস্তাবনা ও আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী ১৫ দফা অনুশাসন প্রদান করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গত ৬ আগস্ট এ সংক্রান্ত একটি ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা নির্দেশনাগুলো হলো: ১. শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ সম্প্রসারণ করা। ২. শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের আচরণবিধি সংশোধন ও শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কাজ থেকে মুক্ত রাখা। ৩. শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন করা। ৪. দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা যেন সেরা শিক্ষকদের ক্লাস গ্রহণের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যে একটি ডেডিকেটেড ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই করা। ৫. প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান অনলাইনে তদারকি করা। ৬. শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা ও পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা। ৭. ডেডিকেটেড প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অব্যবহৃত ভবন শিক্ষক প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা। ৮. গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ এবং শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান। ৯. ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শিক্ষকদের পদক ও পুরস্কারের মাধ্যমে পাঠদান ও নেতৃত্বগুণ বিকাশে উৎসাহিত করা। ১০. শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য ও আগ্রহ অনুযায়ী কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো। ১১. শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে কেন্দ্রীয় গবেষণা ডাটাবেজ গড়ে তোলা এবং স্থানীয় চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া। ১২. ক্লাসরুমে শিক্ষকরা যেনো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে পাঠদান আকর্ষণীয় করেন, তা নিশ্চিত করা। ১৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ। ১৪. প্রশিক্ষণ কার্যক্রম মূল্যায়ন তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা, যাতে শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। ১৫. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ পরবর্তী ভালো চর্চা ও সফল অভিজ্ঞতা সারাদেশে বিস্তৃতির লক্ষ্যে শিক্ষকদের ‘এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা’ করতে হবে।

মাউশির তদারকি ও অগ্রগতি

প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশনার বেশির ভাগ বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে মাউশি। গত ২০ আগস্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উইংভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনসহ সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়। 

মাউশি জানিয়েছে, সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার পর যেসব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, মন্ত্রণালয়ে তার বিস্তারিত অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি সেপ্টেম্বর থেকে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষক প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে। আইসিটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যেই ৩ লাখ ৫ হাজার ২৮৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। 

দক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে ‘মাস্টার ট্রেইনার পুল’ ও ‘টিচার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালুর পাশাপাশি এনসিটিবি’র সঙ্গে সমন্বয় করে অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে।

মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল তদারকি জোরালো করতে প্রধান শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পিডিএস-এ আপডেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’-এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সরাসরি লাইভ ভিডিও কলে মনিটরিং করবেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এছাড়া গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ঘাটতি মেটাতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে নতুন ক্যাটাগরিতে শিক্ষদের ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক ও পুরস্কার প্রদান এবং সংসদ টিভির প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর খসড়া কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সহশিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিতেও মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক। সম্প্রতি আমরা একটি বৈঠক করে প্রতিটি উইংকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কাজ ভাগ করে দিয়েছি। একই সঙ্গে চলমান কাজসহ একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণ, অ্যাপভিত্তিক লাইভ মনিটরিং ও জাতীয় শিক্ষা চ্যানেলের প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।’

অনুশাসন বাস্তবায়ন তদারকির ফোকাল পার্সন ও মাউশির উপপরিচালক (এইচআরএম) মো. শওকত হোসেন মোল্ল্যা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো শতভাগ বাস্তবায়নে নিবিড় মনিটরিং নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করছে, তা সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদী হওয়ায় দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে ও কিছু বিষয় ইতোমধ্যেই চলমান রয়েছে। তবে ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর মতো কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সমন্বয়ে শতভাগ বাস্তব রূপ দেওয়া হবে।

এম