বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, আমলাতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি নাম তোফায়েল আহমেদ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা বাকশালের অন্যতম প্রধান নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ‘মুজিব বাহিনী’র অন্যতম শীর্ষ নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি, যাকে রাজনৈতিক মহলে দলটির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব বলা হতো।
১৯৭১ সালে ভারতের দেরাদুনে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুজিব বাহিনী বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেন। যুদ্ধকালীন এই বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে জেনারেল উবানের লেখা ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগং: দ্য ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ’ বইটিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বাহিনীর অন্যতম কমান্ডার তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তার অন্যতম প্রধান আস্থাভাজন।
তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় থেকেই এই বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসী সরকারের অধীনস্থ মূল মুক্তিবাহিনীর সমান্তরাল একটি শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল মুজিব বাহিনী এবং তারা তৎকালীন সরকারের একক কর্তৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী-বিরোধী ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতাকারী অন্যান্য দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের দমনেও এই বাহিনী ভূমিকা রেখেছিল।
স্বাধীনতার পর এই মুজিব বাহিনীর সদস্যদের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলা হয় আধাসামরিক বাহিনী ‘রক্ষিত বাহিনী’। সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তোফায়েল আহমেদ অনানুষ্ঠানিকভাবে এই রক্ষী বাহিনীর প্রধানের ভূমিকা পালন করেন বলে রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। রক্ষী বাহিনীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভূমিকার কারণে তৎকালীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বামপন্থী বিরোধী দলগুলোর ওপর তীব্র দমনপীড়ন চালানো হয়, যাতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার নেতাকর্মী প্রাণ হারান বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়। এই বাহিনীর উত্থান ও কার্যক্রমের ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে এক মরণঘাতী দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ফাটল তৈরি হয়।
মুজিব বাহিনীর এই প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বিবেচনায় এই বাহিনীর অনুগত ক্যাডারদের সিভিল প্রশাসনে আত্মীকরণ করা হয়। প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে এদের একটি অংশ ‘তোফায়েল ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিতি পায়, যা নিয়ে আমলাতন্ত্রে দীর্ঘকাল ধরে নানা গুঞ্জন বিদ্যমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশ যে রাজনৈতিক বিদ্রোহের পরিবেশ তৈরি করেছিল, তার মূলে ছিল প্রশাসনে থাকা এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। দেশের প্রশাসন, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুজিব বাহিনী ও তার নেতাদের তৈরি করা এই মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের প্রভাব আজও গভীরভাবে টিকে রয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা।
এসএইচ