ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তারের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কারাকাসসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে রয়েছেন। এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—মাদুরোর পরিণতিও কি একসময়কার মার্কিন টার্গেট সাদ্দাম হোসেন বা ম্যানুয়েল নরিয়েগার মতোই হতে যাচ্ছে?
ভেনেজুয়েলায় রাতের আঁধারে হামলা
শনিবার রাতে ভেনেজুয়েলার একাধিক সেনাঘাঁটি, বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। সরকারি সূত্র জানায়, অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল দেশটির সামরিক অবকাঠামো অকার্যকর করা। হামলার কিছুক্ষণ পরই ওয়াশিংটন থেকে ঘোষণা আসে—ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স। অভিযানের সময় মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালানো হলেও তারা নিরাপদ রয়েছে বলে জানানো হয়।
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র প্রস্তুত রয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের মতে, ভেনেজুয়েলাকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের পথ তৈরি করেছিলেন মাদুরো।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
মাদুরোর গ্রেপ্তারের ঘোষণার পর বিশ্লেষকেরা তুলনা টানছেন যুক্তরাষ্ট্রের আগের তিন অভিযানের সঙ্গে।
ম্যানুয়েল নরিয়েগা: ১৯৮৯ সালে পানামায় সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের অভিযোগে দণ্ডিত হয়ে শেষ পর্যন্ত কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হোসেন: ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে ইরাকি আদালতে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ: হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হলেও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমায় মুক্তি পান। তবে মুক্তির পরও তার রাজনৈতিক ও আইনি সংকট কাটেনি।
মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ
বাসচালক থেকে শ্রমিক নেতা—সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি; নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক যাত্রা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী। হুগো শ্যাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৩ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক বরাবরই বৈরী। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, মাদুরো কর্তৃত্ববাদী শাসনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করেছেন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে মাদুরোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তার সরকার উৎখাতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যুত্থানচেষ্টার পেছনে সক্রিয়।
২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অর্ধশতাধিক দেশ তাকে ভেনেজুয়েলার বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
সামনে কী?
নরিয়েগার মৃত্যু কারাগারে, সাদ্দামের ফাঁসি, হার্নান্দেজের ক্ষমা—এই তিনটি উদাহরণ দেখিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক নেতাদের পরিণতি একরকম হয় না। মাদুরোর ক্ষেত্রে কোন পথে হাঁটবে ইতিহাস—আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন সেই উত্তরের দিকেই তাকিয়ে।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ, লাতিন আমেরিকার শক্তির ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকায় এই ঘটনা কতটা প্রভাব ফেলবে—তা নির্ধারিত হবে সামনের দিনগুলোতেই।