মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান তৃতীয় দিনে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করেছে। সংঘাত এখন শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে লেবানন। একই সঙ্গে কুয়েতে ভুলবশত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
লেবাননে নতুন রণক্ষেত্র
শনিবার শুরু হওয়া এই যুদ্ধের নতুন একটি ফ্রন্ট খুলেছে সোমবার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এদিন ইসরায়েল লক্ষ্য করে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে হিজবুল্লাহ। জবাবে লেবাননের রাজধানী বৈরুত ও দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সোমবারের হামলায় দেশটিতে অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৪৯ জন আহত হয়েছেন।
কুয়েতে ভুলবশত ৩টি মার্কিন এফ-১৫ ভূপাতিত
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুলবশত যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। বিমানগুলো ইরান-সংক্রান্ত অভিযানে নিয়োজিত ছিল। তবে বিমানে থাকা ছয়জন ক্রু সদস্যই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন এবং বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল।
ইরানজুড়ে লাশের মিছিল
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, শনিবার থেকে এ পর্যন্ত ১৩১টি শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়েছে। দুবাই, আবুধাবির নিকটবর্তী আল-সামহা এবং কাতারের রাজধানী দোহায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ড্রোন হামলায় আগুন ধরে যাওয়ায় সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগারটি বন্ধ করে দিয়েছে।
পারমাণবিক কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কা
ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি। আর জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি সতর্ক করে বলেছেন, যদি বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা হয় এবং সেখান থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলো থেকে গণ-উচ্ছেদ প্রয়োজন হতে পারে। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের কোনও পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনও ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
উপসাগরীয় দেশ ও আমেরিকার যৌথ বিবৃতি
এক যৌথ বিবৃতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ‘নির্বিচার এবং বেপরোয়া’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, বাহরাইন, ইরাক (কুর্দিস্তান অঞ্চলসহ), জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের এই হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এদিকে সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটিতে হামলার উদ্দেশ্যে আসা দুটি ড্রোন সোমবার রুখে দেওয়া হয়েছে। এর আগে রবিবার রাতেও সেখানে একই ধরনের হামলা হয়েছিল।
জ্বালানি বাজারে যুদ্ধের ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে টালমাটাল হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ট্যাঙ্কার চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় হু হু করে বাড়ছে তেল ও গ্যাসের দাম। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক লাফেই ৪২ শতাংশ বেড়ে গেছে।
সোমবার কাতার এনার্জি তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর এই অস্থিরতা শুরু হয়। আইসিই কমোডিটি এক্সচেঞ্জে এপ্রিল মাসে সরবরাহের জন্য গ্যাসের ফিউচার কন্টাক্টের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৫.৪৬ ইউরোতে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাস হারানো ইউরোপ এখন পুরোপুরি কাতার ও অন্যান্য দেশের এলএনজি চালানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কাতারের এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের জন্য বড় দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের রাস তানুয়া তেল শোধনাগারে সোমবার ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ওই শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
দাম্মামের কাছে অবস্থিত রাস তানুয়া শোধনাগারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল শোধন করার সক্ষমতা রয়েছে।
বাতিল হাজার হাজার ফ্লাইট
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রধান বিমানবন্দরগুলো গত দুই দিন ধরে বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সংঘাত এখন ইরান-ইসরায়েল সীমা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। জ্বালানি, বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা — তিন ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না হলে এই সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, এপি
এম