ঢাকা: যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পারমাণবিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের মধ্যে পাকিস্তানও অন্যতম বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড বুধবার ওই মন্তব্য করেছেন।
বুধবার মার্কিন সিনেটের ইন্টেলিজেন্স কমিটির বৈঠকে ২০২৬ সালের বার্ষিক হুমকি মূল্যায়ন উপস্থাপন করেন তুলসি গ্যাবার্ড। সেখানে বিশ্বের কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক হুমকি হয়ে উঠছে বলে জানান তিনি।
[267701]
বৈঠকে তুলসি গ্যাবার্ড বলেন, পাকিস্তান ছাড়াও ইরান, চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া সক্রিয়ভাবে পরমাণু ও প্রচলিত ওয়ারহেড বহনে সক্ষম নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম বলে সতর্ক করে দেন তিনি।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সতর্ক করে গ্যাবার্ড বলেন, ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। তিনি বলেন, ‘‘রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও পাকিস্তান বিভিন্ন ধরনের উন্নত ও প্রথাগত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়ন চালিয়ে যাচ্ছে; যা আমাদের মাতৃভূমিকে তাদের নাগালে নিয়ে এসেছে।’’
মার্কিন এই গোয়েন্দা প্রধান বলেন, পাকিস্তানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির তালিকায় সম্ভবত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে; যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে পারে।
বার্ষিক হুমকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে; যাতে তারা নিজেদের কর্মসূচিকে সেই অনুযায়ী সাজাতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, আগামী এক দশকে এই ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি আরও বাড়বে। ২০৩৫ সাল নাগাদ এই হুমকির পরিমাণ বর্তমানের ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বেড়ে তা ১৬ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ সুজা নওয়াজ ওই মূল্যায়নকে পূর্ববর্তী মার্কিন নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বাইডেন প্রশাসনও পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। তবে পাকিস্তানের শাহিন-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের কম এবং ইসলামাবাদ বারবার বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল ভারতকে মোকাবিলার জন্য। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনও দেশে আঘাত হানার কারণ পাকিস্তানের নেই। তবে এই ধরনের মূল্যায়ন উদীয়মান মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের বিষয়ে সাধারণত ইতিবাচক বার্তা দিলেও এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, মূল্যায়নে পাকিস্তানকে এককভাবে লক্ষ্য করা হয়নি; বরং অন্য দেশগুলোর সঙ্গেই দেশটির নাম নেওয়া হয়েছে।
গ্যাবার্ড সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য এখনো বড় হুমকি। প্রতিবেদনে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাকে ‘দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কাশ্মিরের পেহেলগাম হামলার পর দুই দেশের মধ্যে যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে উত্তেজনা প্রশমিত হলেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যেকোনও সময় সঙ্কটের অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এছাড়া পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা এবং তালেবানের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান চলতি মাসে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তালেবানকে অবশ্যই পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।
ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে তুলসি বলেছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের সরকার কিছুটা দুর্বল হলেও তারা এখনো অটল রয়েছে। তেহরান ও তাদের প্রক্সিরা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর হামলা চালাতে সক্ষম। অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানকে বেশ কোণঠাসা করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শুনানিতে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট সিনেটর মাইকেল বেনেটের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ইরানের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা নিয়ে অস্পষ্টতার অভিযোগ তোলেন বেনেট। এছাড়া গোয়েন্দা প্রধানের শীর্ষ সহযোগী জোসেফ কেন্টের পদত্যাগের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, ডন।
এসআই