৮০ দেশে ৭৫০টি মার্কিন ঘাঁটি, নেপথ্যে কোন কৌশল?

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালী নিউজ
  • প্রকাশিত: মে ২, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
ফাইল ছবি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে বর্তমানের স্নায়ুযুদ্ধ কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই-সবক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতাকে সীমানার বাইরে ছড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৭৫০টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের এই বিশাল উপস্থিতি যেমন ক্ষমতার প্রতীক, তেমনি এটি আধুনিক ইতিহাসের এক বিরল সামরিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণা ও সামরিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি সেনা ও বেসামরিক কর্মী মোতায়েন রয়েছে। এই বিশাল বাহিনী শুধু প্রতিরক্ষামূলক কাজই নয়, বরং দ্রুত যেকোনো স্থানে আক্রমণ পরিচালনা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে।

ইউরোপীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবেই সবচেয়ে সংহত। বিশেষ করে জার্মানিকে কেন্দ্র করে তাদের বড় সামরিক হাব গড়ে উঠেছে। জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। এখানকার রামস্টেইন এয়ার বেস এবং ল্যান্ডস্টুল সামরিক হাসপাতাল শুধু ইউরোপ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মার্কিন অভিযানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ইতালি, যুক্তরাজ্য ও স্পেনে রয়েছে কয়েক হাজার সেনা ও শক্তিশালী নৌঘাঁটি, যা ন্যাটো জোটের নিরাপত্তা কাঠামোর মূল ভিত্তি।

এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীন ও উত্তর কোরিয়ার প্রভাব মোকাবিলা করা। জাপানে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১২০টি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে এবং সেখানে ৫০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন আছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত ক্যাম্প হামফ্রিজ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি। এ ছাড়া ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশল জোরদার করছে ওয়াশিংটন।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি এই অঞ্চলের বৃহত্তম কেন্দ্র, যেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর সরাসরি পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ও তেলের পরিবহন পথ নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।

আফ্রিকায় জিবুতির ক্যাম্প লেমনিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। এখান থেকে মূলত সোমালিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে ড্রোন অপারেশন এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম চালানো হয়। লাতিন আমেরিকায় কিউবার গুয়ানতানামো বে ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পুরনো স্থাপনা।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধের সময় দ্রুত রসদ সরবরাহ, মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকিয়ে রাখাই এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের প্রধান উদ্দেশ্য। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে সেনা কমানোর আলোচনা চলছে, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন এটি কোনো পিছুটান নয়, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত পুনর্গঠন মাত্র। 

ইরানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নানা মতবিরোধের জেরে এই সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিলেও, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক প্রভাবই ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে টিকে আছে। তবে আগামী দিনগুলোতে এই উপস্থিতি আরও বাড়বে নাকি কৌশলগত কারণে সংকুচিত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এসএইচ